বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে নকল এন-৯৫ মাস্ক!

সিটি নিউজ ডেস্ক:: বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) করোনা ইউনিটে দায়িত্বরত চিকিৎসকদের জন্য কর্তৃপক্ষ এন-৯৫ মাস্ক দেওয়ার কথা বললেও তাদের নকল মাস্ক দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন একাধিক চিকিৎসক।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক চিকিৎসক জানান, বিএসএমএমইউতে করোনা রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া শুরু হয় গত ৪ জুলাই। তার আগে গত ২৪ জুন থেকে শুরু হওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের কোভিড ইউনিটের ওরিয়েন্টেশন প্রোগ্রামে বলা হয়, কর্মরত চিকিৎসকদের সুরক্ষায় ১৮৬০ এন-৯৫মাস্ক দেওয়া হবে, অন্যান্য মানসম্পন্ন সুরক্ষা সামগ্রীও দেওয়া হবে।

কিন্তু প্রথম ব্যাচের চিকিৎসকরা ডিউটি শুরু করার পর তাদের দেওয়া হয় ৮২১০ এন ৯৫ মাস্ক। তাতেও চিকিৎসকদের কোনও অভিযোগ ছিল না। কিন্তু তৃতীয় গ্রুপের চিকিৎসকরা কাজ শুরু করতেই বাধে বিপত্তি। তাদের দেওয়া হয় নকল এন-৯৫ মাস্ক। নকল মাস্কগুলোতে লেখা ভুল, লট নাম্বার নেই। প্রকৃতপক্ষে আসল এন-৯৫ মাস্কের সঙ্গে নকল মাস্কও সরবরাহ করেছে কোম্পানি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক চিকিৎসক বলেন, গত শনিবার যখন বিষয়টি হাসপাতাল পরিচালকের নজরে আনা হয় তখন তিনি নকল মাস্কগুলো বদলে দেন। তিনি নতুন করে যেগুলো দেন সেগুলোও নকল ছিল।

সংশ্লিষ্টরা বলেন, কোনও রকম স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ছাড়াই নিজস্ব লোকদের মাধ্যমে এসব কেনাকাটা হয়েছে। টেন্ডার প্রক্রিয়া হয়নি, মান যাচাই না করে, যাচাই-বাছাই কমিটি ছাড়াই এসব কেনাকাটা সম্পন্ন করেছে কর্তৃপক্ষ।

চিকিৎসকরা বলছেন, করোনা ইউনিটে ভর্তি রোগীদের জন্য একেকটি গ্রুপে ৪৫ জন আবাসিক চিকিৎসক থাকেন। তাদের প্রত্যেককে পাঁচটি করে মাস্ক দেওয়া হয় সাতদিনের ডিউটি করার জন্য। তাদের প্রায় প্রত্যেকেই দুই থেকে তিনটি করে নকল মাস্ক পেয়েছেন। এরপর পরিচালককে জানানোর পর সেগুলো রিপ্লেস করে নতুন মাস্ক দেওয়া হয়, কিন্তু রিপ্লেস করা নতুন মাস্কও ছিল নকল। চিকিৎসকরা বলছেন, যারা নকল মাস্ক সাপ্লাই দিচ্ছেন তাদের সঙ্গে তো চুক্তি করা। তারা তো সবসময়ই এসব নকল মাস্ক দিতে থাকবে। তাই আমাদের সুরক্ষা বলতে কিছু থাকছে না।

চিকিৎসকরা বলছেন, মাস্ক ও অন্যান্য পিপিই কেনার সঙ্গে পরিচালক অফিসকে নিযুক্ত করা হয়। যাদের দায়িত্ব ছিল মাস্কের কোয়ালিটি নিশ্চিত করা, তারা ব্যর্থ হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে এত শিক্ষক চিকিৎসক থাকা সত্ত্বেও ‘কোয়ালিটি নিশ্চিতের’ জন্য আলাদা একটি কমিটি করা যায়নি, এটা নিঃসন্দেহে একটি অব্যবস্থাপনা।

এ বিষয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচালক ( হাসপাতাল) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জুলফিকার আহমেদ আমিনের ফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। এসএমএস দেওয়া হলেও তার উত্তর দেননি।

বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ)-এর মহাসচিব ডা. ইহতেশামুল হক চৌধুরী বলেন, বিএসএমইউর মতো একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে কী করে চিকিৎসকদের নকল মাস্ক দেওয়া হলো এটা গবেষণার বিষয়। কারণ, এখানে তো আর স্বাস্থ্য অধিদফতর দেয়নি। তারা নিজেরাই এটা কিনেছেন। পরিচালক বলেছেন, এটা সাপ্লাইয়ার ভুল করেছে। কিন্তু কেউ নকল মাস্ক দিলেই সেটা চিকিৎসকদের দিতে হবে কেন প্রশ্ন করে ডা. ইহতেশামুল হক বলেন, কোন মাস্ক দেওয়া হয়েছে, কত টাকার মাস্ক দেওয়া হয়েছে, তাদের রিকমেন্ডশন অনুযায়ী মাস্ক দিয়েছে কিনা এসব বিষয় কর্তৃপক্ষ দেখেনি কেন। তিনি বলেন, মাস্কের মান যাচাই না করে এগুলো বিতরণ করা ঠিক হয়নি। তারা এখন বলছেন সরবরাহকারী ভুল করেছে। কিন্তু কর্তৃপক্ষ কী করলো? বিতরণ করার আগে এগুলো দেখা উচিত ছিল। যেখানে প্রতিদিন চিকিৎসকসহ অন্যরা মারা যাচ্ছেন, আক্রান্ত হচ্ছেন, সেখানে এমন ভুল করে সাপ্লাইয়ারের ওপর দায় চাপানো মোটেই গ্রহণযোগ্য নয়।

দেশে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের পর গত মার্চ মাসে কেন্দ্রীয় ঔষধাগার থেকে সরবরাহ করা এন ৯৫ মাস্ক এবং অন্যান্য সুরক্ষা সামগ্রীর নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। তখন মুগদা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল থেকে এই মাস্ক নিয়ে লিখিত অভিযোগ করা হয়। অভিযোগে বলা হয়, প্যাকেটের গায়ে এন ৯৫ লেখা থাকলেও নিম্নমানের মাস্ক এবং পিপিই দেওয়া হয়েছে। এ নিয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় তদন্ত কমটি গঠন করে।

কেবল মুগদা নয়, ঢাকার বাইরের বেশ কিছু হাসপাতাল থেকেও নিম্নমানের মাস্ক নিয়ে অভিযোগ আসে। মুগদা হাসপাতালে দেওয়া নকল মাস্ক নিয়ে মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটি একে পরিকল্পিত প্রতারণা ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বলেছে। সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সুপারিশ করেছে। বিষয়টি নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনও (দুদক) অনুসন্ধান করছে।

বাংলা ট্রিবিউনক

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin