বরিশাল বিসিকের উন্নয়নকাজে বাধা, অভিযোগের তীর মেয়রের দিকে

তন্ময় দাস::

বরিশালে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) উন্নয়নকাজ বাধার মুখে বন্ধ রয়েছে। সিটি করপোরেশনের মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহ ও তার লোকজন কাজে বাধা দিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।   

এ ছাড়া শফিউল আজমসহ দুজন ব্যবসায়ীর ওপর হামলা চালানোর অভিযোগ পাওয়া গেছে। শফিউল আজমের ওপর হামলার ঘটনায় তিনি নিজে কাউনিয়া থানায় মামলা করেছেন।

বিসিক বরিশালের কয়েকজন ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, বিসিকের উন্নয়নের জন্য ২০১৮ সালে ৭৪ কোটি টাকা বরাদ্দ হয়। সড়ক, নালা ও সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ এবং নিচু জমি ভরাট করার সেসব কাজ নিজের লোকজন না পাওয়ায় ক্ষুব্ধ হন মেয়র সাদিক। এরপর থেকে বিভিন্ন সময় উন্নয়নকাজে বাধা দেয়া হয়।

বিসিকের উপমহাব্যবস্থাপক জালিস মাহমুদ বলেন, ৩৭ একর নিচু জমি ভরাট করার জন্য বালু ফেলার ৩৬ লাখ টাকার ড্রেজার (খননযন্ত্র) ও পাইপ সিটি করপোরেশনের লোকজন নিয়ে যাওয়ায় জমি ভরাট বন্ধ হয়ে গেছে। সামনের দিকের সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ কাজ শুরু করলে করপোরেশন থেকে দাবি তোলা হয়, বিসিককে ৪ ফুট জমি ছেড়ে প্রাচীর নির্মাণ করতে হবে। তারা চিঠি দিয়ে কাজ বন্ধ করে দিয়েছে।

তিনি বলেন, বহিরাগতরা একের পর এক শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মালিকদের ওপর হামলা করেছে। এর প্রতিবাদে ২৪ অক্টোবর ব্যবসায়ীরা নগরীতে মানববন্ধনের উদ্যোগ নেন। কিন্তু হামলার সঙ্গে জড়িতরা ভাড়াটে লোকজন দিয়ে পাল্টা মানববন্ধন করে বিসিকের বিরুদ্ধে স্লোগান দেয়। এতে ব্যবসায়ীদের মানববন্ধন পণ্ড হয়ে যায়।

জালিস জানান, নিচু জমি ভরাট করতে পারলে ৩০টি প্লট করে উদ্যোক্তাদের বরাদ্দ দেয়া যেত। এতে কমপক্ষে ১০ হাজার লোকের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতো।

বরিশাল নগরীর কাউনিয়ায় ১৯৬৭ সালে ১৩০ একর জমিতে বিসিক শিল্প নগরী স্থাপিত হয়। বর্তমানে এখানে ১৩৮টি ছোট-বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান রয়েছে।

বিসিক শিল্পমালিক সমিতির এক নেতা জানান, ২০১৮ সালে দরপত্র হওয়া এই কাজ পান চারজন ঠিকাদার। তারা কাজ শুরু করতে বাধার সম্মুখীন হন। মেয়র নিজে নন, লোকজন দিয়ে বিসিক শিল্প এলাকায় উন্নয়নমূলক কাজে বাধা দেন।

বিসিক শিল্পমালিক সমিতির সভাপতি ও ফরচুন সুজের চেয়ারম্যান মিজানুর রহমানের অভিযোগ, ছাত্রলীগ নেতা হিসেবে পরিচিত রইজ আহমেদ মান্না ও তার সহযোগীরা শিল্পমালিক হিমাদ্রি সাহাকে ২০ অক্টোবর এবং মো. শফিউল আজমকে ২৪ অক্টোবর মারধর করেছেন। সব উন্নয়ন কাজ বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।

২৪ অক্টোবর মেয়র সাদিক আবদুল্লাহ বিসিক পরিদর্শনে যান। ওই দিন মিজানুরের ভাই শফিউল আজমকে মেয়রের সামনে মারধর করেন মান্না ও সন্ত্রাসী বাহিনী। শিল্পমালিক সমিতির বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়ার জন্য ব্যবসায়ীদের ডেকে ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে।

বিসিক শিল্প মালিক সমিতির সভাপতি আরও বলেন, ‘পুরো বিষয়টি বরিশালের রাজনৈতিক অভিভাবক সংসদ সদস্য আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ (মেয়রের বাবা) এবং বিসিকের চেয়ারম্যান আব্দুস সালামকে অবহিত করা হয়েছে। তা ছাড়া বিষয়টি নিয়ে মেয়রের শ্যালক মিলন ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলেছি। তাকে জানিয়েছি, সামনে আরও ৫৪ কোটি টাকার কাজ রয়েছে; সেগুলো আপনারা দেখেন।’

মিজানুর রহমান বলেন, ‘মেয়র সাদিক আব্দুল্লাহর সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করেছি। কিন্তু তিনি কোনো সাড়া দেননি।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন জ্যেষ্ঠ কাউন্সিলর বলেন, বিসিক শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীন স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান। সিটি করপোরেশনের সেখানে কোনো কাজ নেই। মেয়র কী কারণে বিসিকের বিষয়ে হস্তক্ষেপ করলেন, বিষয়টি তাদের বোধগম্য নয়।

বিসিক শিল্প মালিক সমিতির সভাপতি মিজানুর রহমান বলেন, ‘এ রকম যদি ব্যবসায়ীরা বাধা ও মারধরের শিকার হন, তাহলে তো বরিশালে কেউ ব্যবসাই করতে আসবেন না। আমার কারখানায় প্রায় ৫ হাজার শ্রমিক কাজ করেন। আমিও এখন এখান থেকে চলে যাওয়ার চিন্তা-ভাবনা করছি।’

ব্যবসায়ীদের ওপর হামলার অভিযোগের ব্যাপারে রইজ আহম্মেদ মান্না বলেন, ‘অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। আমি বিসিকে গিয়েছি করপোরেশনের স্টাফ হিসেবে। ভাইয়া (মেয়র) সেদিন বিসিকে গিয়েছিলেন। তখন সাধারণ মানুষ তাদের অভিযোগগুলো বলছিলেন ভাইয়ার কাছে। সে সময় শফিউল আজম জনগণের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করলে তাকে সরিয়ে দেয়া হয় সেখান থেকে।’  

অভিযোগের ব্যাপারে সিটি করপোরেশনের মেয়র ও নগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। দুই দিন বেশ কয়েকবার ফোন করার চেষ্টা করে তার মোবাইল ফোন ব্যস্ত পাওয়া যায়। পরে এসএমএস পাঠিয়েও তার সাড়া পাওয়া যায়নি।

সিটি করপোরেশনের প্রশাসনিক কর্মকর্তা কাজী মোয়াজ্জেম হোসেন নিউজবাংলাকে বলেন, ব্যবসায়ীদের মারধরের অভিযোগ সঠিক নয়। বিসিক সিটি করপোরেশন এলাকায় অবস্থিত। তাই বিসিকের উন্নয়ন মানে সিটি করপোরেশনের উন্নয়ন।

সুত্র, নিউজ বাংলা

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin