শিক্ষকদম্পতির পেনশনের টাকায় গণপাঠাগার

বরিশাল নগরীর কাউনিয়া প্রধান সড়কসংলগ্ন মনসা বাড়ির গলিতে তার চারতলা ভবন। নিচতলার ২৫ শ স্কয়ার ফুটের এই পাঠাগারে ইতিমধ্যে হাজারের বেশি বই রাখা আছে।


সিটি নিউজ ডেস্ক: নজরুল হক নীলু তখন সপ্তম শ্রেণির ছাত্র। সেই বয়সে তার প্রথম আউট বই পড়া। এরপর বইয়ের প্রেমে পড়ে যান। একপর্যায়ে তা আসক্তিতে পরিণত হয়। হাতে টাকা এলে বই কেনেন। রাত জেগে বই পড়েন

পেশা হিসেবে বেছে নেন কলেজশিক্ষকতা। প্রতি মাসে বেতন পাওয়ার পরই কিছু টাকা বাঁচিয়ে বই কিনতেন। তার স্ত্রীও কলেজে শিক্ষকতা করতেন। তিনিও বই ভালোবাসেন। দুজনই পেনশনের টাকায় নিজ বাড়িতে জনসাধারণের জন্য একটা পাঠাগার করেছেন।

বরিশাল নগরীর কাউনিয়া প্রধান সড়কসংলগ্ন মনসা বাড়ির গলিতে তার চারতলা ভবন। নিচতলার ২৫ শ স্কয়ার ফুটের এই পাঠাগারে ইতিমধ্যে হাজারের বেশি বই রাখা আছে।

সাতটি আলমিরায় তাকে তাকে সাজানো বই। চারটি বড় টেবিল পাতা। পাঠকদের বসার জন্য সাজিয়ে রাখা হয়েছে ৫০টি চেয়ার। শুধু বই নয়, অনেক পুরনো সাপ্তাহিক ম্যাগাজিন, দৈনিক সংবাদপত্রের বিশেষ সংখ্যাও সংরক্ষণ করেছেন। ইতিহাস, রাজনীতি, দর্শন, জীববৈচিত্র্য নিয়ে লেখা বইয়ের আধিক্য এখানে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, সমরেশ বসু, সমরেশ মজুমদার, দেবব্রত পাল, আবুল বাশারসহ দুই বাংলার জনপ্রিয় লেখকদের বই রাখা হয়েছে এখানে। রয়েছে ধর্ম নিয়ে গবেষণাধর্মী বই। দেশ ও বিচিত্রাসহ নানা ম্যাগাজিনের ৩০ বছর আগের সংখ্যাও আছে।

নজরুল হক নীলু বানারীপাড়া ডিগ্রি কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সহকারী অধ্যাপক ছিলেন। ২০১৮ সালের জুনে অবসরে যান। ৩৩ বছরের শিক্ষকতা জীবনে প্রতি মাসের বেতন থেকেই তিনি কিছু টাকা বাঁচিয়ে বই কিনেছেন। সেগুলোর সংখ্যা সহস্রাধিক। তা দিয়েই আপাতত শুরু। তবে আরও বই কিনবেন।

এই পাঠাগার গড়তে সার্বিক সহযোগিতা দিয়েছেন তার স্ত্রী শহীদ জিয়াউর রহমান ডিগ্রি কলেজের সাবেক প্রভাষক মাহমুদা বেগম মুনমুন। তার পেনশনের টাকাও যুক্ত হয়েছে এই পাঠাগারে।

জানতে চাইলে নজরুল হক নীলু বলেন, ‘সপ্তম শ্রেণির ছাত্রাবস্থায় বই পড়ার নেশা আমাকে পেয়ে বসে। বই পড়ে আমি বিমল আনন্দ পাই। সন্ধ্যায় বই পড়া শুরু করে ভোর হয়ে গেছে, এমন ঘটনা জীবনে অনেকবার ঘটেছে। যে কোনোভাবে হাতে কিছু টাকা এলেই বই কিনতাম। সেগুলো সংগ্রহ করতাম।’

জনসাধারণের জন্য নিজের সংগ্রহের বই খুলে দেয়ার ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘আমাদের মনের অন্ধকার দূর করতে এবং সত্যকে জানতে জ্ঞানের বিকল্প নেই। জ্ঞান লাভের একটি উপায় হলো বই পড়া। কিন্তু খেয়াল করে দেখেছি, যান্ত্রিক ও প্রযুক্তির যুগে আমাদের তরুণ সমাজের মধ্যে বই পড়ার আগ্রহ কমে গেছে। নতুন প্রজন্ম মোবাইল ফোনের মাধ্যমে প্রযুক্তি ব্যবহারে মাত্রাতিরিক্ত আসক্ত হয়ে পড়েছে। এগুলো যত কম ব্যবহার হবে, ততই মঙ্গল। তাই নতুন প্রজন্মকে বইমুখী করা অতি জরুরি। কারণ বই-ই একমাত্র প্রাকৃতিক। আমরা তাই তাদের জন্য এই পাঠাগার করেছি।’

তিনি আরও বলেন, ‘গবেষণাধর্মী প্রায় সব ধরনের বই আছে এই পাঠাগারে। আরও সংগ্রহের চেষ্টা করছি।’

নজরুল হক বলেন, পাঠাগারটির জন্য একটি ট্রাস্ট গঠন করা হবে। কাজ চলছে। সেখানে নগদ ১০ লাখ টাকা দেবেন। এ ছাড়া তিনতলার মোট তিনটি ফ্লোরের একটি ভাড়া পাবে পাঠাগারের ট্রাস্ট। এখানে একজন লাইব্রেরিয়ান রাখা হয়েছে। লাইব্রেরির পাশেই একটি কক্ষে তার থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে। সবকিছু ঠিকঠাক হলে শিগগিরই এই পাঠাগারের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করবেন।

তার এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়েছেন বরিশাল নগরীর বিশিষ্টজনরা। তারা জানিয়েছেন, নজরুল হক নীলু একজন শিক্ষক। জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দিতে তার উদ্যোগ মহৎ। তা দেখে অনেকেই উৎসাহিত হবেন।

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin