৭১ এর সেই দিনে নির্ভীক মুক্তিযোদ্ধা কুতুব

তপন চক্রবর্তী ॥ ১৯৭১ সালের অক্টোবর মাসের শেষের দিকে- স্থান পশ্চিম বঙ্গের সীমান্তে হিঙ্গলগঞ্জ। পূর্বে নদী তারপর পূর্ব পাকিস্তান তথা বাংলাদেশের সীমান্তের এখন বাসন্তীপুর। বিহারে ট্রেনিং পাওয়া মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্পে আছি আমরা কয়েকজন। আমি কুতুব, সাবু প্রবাল, মিন্টু বসু এবং অন্যান্যরা। রাতে কোথাও যেতে হবে কিন্তু সেটা কখনই আগে জানানো হতনা। সকালে মুক্তিযোদ্ধাদের খাওয়ার জন্য বাজারে যেতে হবে, সেদিন আমি আর কুতুব বাজারে গেলাম। বাজারে গিয়ে দেখি পালং শাকের কেজি দুই টাকা আর আপেলেরও তাই। আপেল পূর্ব পাকিস্তানে তখন দুর্লভ আর কেজি বিশ টাকা। কুতুব বলল আজ আপেলই নিয়ে যাই তাই দিয়ে তরকারি খাব। আপেলই কিনে নিয়ে এলাম। তরকারি রান্না হোল, সে এক অদ্ভুত স্বাদে কিন্তু সবাই মজা করে খেল। তখন অনশ্চিত ভবিষ্যত কিন্তু সে দিন গুলির কথা বারবার মনে পড়ে।

আরেকটি দিনের কথা বিশেষ করে মনে পড়ে- ১৯৭১ সালের ২১ নভেম্বর। পাক বাহিনী আর রাজাকাররা বাসন্তীপুর থেকে সাতক্ষীরার দিকে পিছু হটছে আর মুক্তিযোদ্ধারা পিছু ধাওয়া করছেন। তখন সন্ধ্যা উতরে রাত্রি নেমেছে, আমরা কয়েকজন একটা স্কুল ঘরের মধ্যে গিয়ে ঢুকলাম। সবার সামনে স্টেনগান হাতে কুতুব- সাহসী আর নির্ভীক। স্কুল ঘরের একটি ক্লাসের মধ্যে আমরা কয়েকজন; খুব সাবধানে মোমবাতি জ্বালানো হল যাতে বাইরে থেকে না দেখা যায়। মোমবাতি হাতে কুতুব আর মিন্টু বসু এগিয়ে গেল।

সামনেই ক্লাসের ব্ল্যাক বোর্ড আর বোর্ডের উপর একটা সুদ করার অঙ্ক অর্ধেক করা রয়েছে। আমরা থমকে গেলাম। বোঝা গেল ক্লাসে অঙ্ক করা হচ্ছিল কিন্তু শেষ করার আগেই স্কুলে পাক বাহিনীর হামলা হয়েছে। একটা অদ্ভুত অনুভূতি আমাদের মধ্যে চলে এল। ক্লাসের যেইসব ছাত্ররা কোথায়, শিক্ষকরা কোথায়? তারা কি বেঁচে আছে নাকি সবাইকে পাক সৈন্যরা মেরে ফেলেছে! কিছুক্ষণ নীবরতার পর কুতুব বলল, স্কুল আবার খুলবে আর কখনই বন্ধ হবে না।

সেই স্কুল নিশ্চয়ই চলছে আর বন্ধ হয়নি কিন্তু আমার বন্ধু সাহসী নির্ভীক মুক্তিযোদ্ধা কুতুব উদ্দিন হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে তিনদিন আগে না ফেরার দেশে চলে গিয়েছে। ৭১ সাল দেশের প্রয়োজনে প্রাণের মায়া না করে কুতুব সামনে এগিয়ে গিয়েছে। আজ তার কথা বারবার মনে পড়ে।

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin