আধুনিক বরিশালের রূপকার হিরনের মৃত্যুবার্ষীকী আজ

শফিক মুন্সি, অতিথি প্রতিবেদক ॥ আজ শুক্রবার (৯ই এপ্রিল) প্রয়াত শওকত হোসেন হিরণের ৭ম মৃত্যুবার্ষিকী। ২০১৪ সালের এই দিনে ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি (ইন্না….রাজিউন)।জীবদ্দশায় তিনি ছিলেন বরিশাল সদর আসনের সাংসদ, বরিশাল সিটি কর্পোরেশন (বিসিসি) মেয়র এবং বরিশাল মহানগর আওয়ামীলীগের সভাপতি। তবে এসব রাজনৈতিক পরিচয় ছাপিয়ে নিজ কর্মগুণে তিনি হয়ে উঠেছিলেন আধুনিক বরিশাল নগরীর রূপকার। বরিশালকে শান্তির ও পরমতসহিষ্ণুতার শহর হিসেবেও সারা বাংলাদেশে পরিচিত করিয়েছিলেন তিনি। তবে মৃত্যুর মাত্র সাত বছরের মাথায় নিজ দলেই অনেকটা বিস্মৃত তিনি। হিরণ ক্ষমতায় থাকাকালীন বরিশালে সকল রাজনৈতিক দলগুলোর সহাবস্থান ও পরমতসহিষ্ণুতা ছিল বলে জানিয়েছেন জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব ইকবাল হোসেন তাপস। তিনি বলেন, বিরোধী দলীয় নেতাকর্মীদের হেনস্তা ও পরমত দমন করা বাংলাদেশের রাজনীতির বেশ পুরনো সংস্কৃতি। কিন্তু এই সংস্কৃতি বরিশালে বদলে গিয়েছিল হিরণ মেয়র থাকাকালীন। বিরোধী দলীয় নেতাকর্মীদের ওপর দমন পীড়নের খড়গ বন্ধ করার বিরল উদাহরণ সৃষ্টি করেছিলেন তিনি (হিরণ)। একটি উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, ২০১৩ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামীলীগ সভানেত্রী বরিশালে আসেন। স্বভাবতই নগরজুড়ে আওয়ামীলীগের পোস্টার – ব্যানারে ছেয়ে যায় তখন। কিন্তু এর কদিন পরই বিএনপি সভানেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার বরিশালে আগমনের দিন ঠিক হয়। এ ব্যাপারে বিএনপির স্থানীয় নেতকর্মীরা হিরণের সহায়তা চাইলে নিজ উদ্যোগে আওয়ামীলীগের বড় বড় ব্যানার সড়িয়ে বিএনপিকে ব্যানার লাগানোর জায়গা করে দেন তিনি। এছাড়া বিএনপি সভানেত্রীর সমাবেশ স্থল পরিদর্শন করে সার্বিক নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেন হিরণ। একসময়ের সন্ত্রাসের নগরী খ্যাত বরিশাল বদলে যায় হিরণ মেয়র নির্বাচিত হবার পর। সবরকমের সন্ত্রাস, অন্য দলের নেতা-কর্মীদের ওপর হামলা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, চাঁদাবাজির ঘটনা বন্ধ হয়ে যায় হিরন মেয়র থাকাকালীন। তাঁর জানাজা শেষে তৎকালীন শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু বলেছিলেন, সন্ত্রাসের বরিশালকে শান্তির বরিশালে রূপান্তর করেছেন শওকত হোসেন হিরন।আর বরিশালে অবকাঠামোগত উন্নয়নের রূপকার হিসেবে হিরণের অবদান এখনো শহরের প্রায় প্রতিটি রাস্তার ফলকে তাঁর নাম দেখলেই উপলব্ধি করা যায়। তাঁর মৃত্যুর পর শোক প্রকাশ করে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন, এক সময়ের অবহেলিত বরিশাল শহরকে সাবেক মেয়র হিরন তার আন্তরিকতা ও অক্লান্ত পরিশ্রমে প্রাচ্যের ভেনিসে পরিণত করেছিলেন। বরিশালের উন্নয়নে তার ভূমিকা ছিল অতুলনীয়। বরিশালের মানুষ তাকে চিরদিন গভীর শ্রদ্ধা ও ভালবাসায় স্মরণ করবে। পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, শওকত হোসেন হিরনের ৭ম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে নগরীর মুসলিম গোরস্থান মাদ্রাসা ও এতিমখানায় পবিত্র কোরআন খতম ও দোয়া মোনাজাতের আয়োজন করেছে পরিবার।এরআগে পরিবারের পক্ষ থেকে কবর জিয়ারত করবে হিরণের পারিবারিক সদস্যবৃন্দ ও শুভানুধ্যায়ীরা। এছাড়া নগরীর আলেকান্দায় হিরণের বাসভবনে আগামীকাল বিকেলে (বাদ আছর) দোয়ার আয়োজন করা হয়েছে। বর্তমান করোনা পরিস্থিতি ও সরকারি বিধিনিষেধ বিবেচনায় খুব বেশি আড়ম্বর করা হবে না কোন আয়োজন। মহানগর আওয়ামীলীগের সাবেক এই নেতার মৃত্যুবার্ষিকীতে সংগঠনের পক্ষ থেকে উল্লেখযোগ্য কোন কর্মসূচি রাখার খবর পাওয়া যায় নি। গতকাল রাতে বরিশাল মহানগর আওয়ামীলীগের দপ্তর সম্পাদক হেমায়েত উদ্দিন সুমন সেরনিয়াবাতের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, এখন পর্যন্ত কোন ধরণের কর্মসূচি ঘোষণা করা হয় নি। করোনা পরিস্থিতি জনসমাগম নিষিদ্ধ করেছে সরকার। তারপরও দিনটিকে কেন্দ্র করে দল থেকে কোন কর্মসূচি নেয়া হলে সবাইকে জানিয়ে দেয়া হবে। তবে রাজনৈতিক ভাবে শওকত হোসেন হিরন যতটাই বিস্মৃত হয়ে যাক না কেন বরিশালের গণমানুষের মন থেকে সহসা হারিয়ে যাচ্ছেন না তিনি। এমনটাই আভাস পাওয়া গেলো নগরীর পঞ্চাশোর্ধ বয়সী বাসিন্দা আবদুল গফুর মিয়ার কথায়। ব্যাংক কর্মকর্তা এই মানুষটি বলেন, একটি নগরীতে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে যিনি থাকেন তার কাছে আসলে খুব বেশি কিছু চাওয়ার নেই আমাদের। শান্তিপূর্ণ পরিবেশে বসবাস করার সুযোগ, উন্নত রাস্তাঘাট আর মশা – জলাবদ্ধতা মুক্ত নগরী পেলেই আমরা খুশি। এসব বিষয় গত ত্রিশ বছরের মধ্যে শুধু শওকত হোসেন হিরনই নিশ্চিত করতে পেরেছিলেন। তাই নিজ কর্মগুণে যতদিন তাকে (হিরণ) কেউ ছাড়িয়ে যেতে না পারছে ততদিন তাকে ভুলে যাবার প্রশ্নই আসে না। উল্লেখ্য, ২০০৮ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত বিসিসির দ্বিতীয় নির্বাচনে শওকত হোসেন হিরণ আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী হয়ে মেয়র নির্বাচিত হন। ২০১৩ সালের ১৫ জুন অনুষ্ঠিত তৃতীয় সিটি নির্বাচনে হিরণ বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীর কাছে পরাজিত হন এবং ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে তিনি বরিশাল সদর আসনের সাংসদ (এমপি) নির্বাচিত হন। ২০০৯ সাল থেকে মৃত্যু অবধি তিনি বরিশাল মহানগর আওয়ামীলীগের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এর আগে দেশের সর্বকনিষ্ঠ উপজেলা চেয়ারম্যান হিসেবে ১৯৮৩ সালে বরিশাল সদর উপজেলার দায়িত্ব নেন তিনি।

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin