জীবনের চেয়ে জীবিকার গুরুত্ব যেখানে বড়

দ্বিতীয়বার লকডাউনের কিছুদিন আগে। অফিসের কাজে যাওয়ার জন্য একটা রিকশায় উঠলাম। হঠাৎ লক্ষ্য করলাম রিকশাচালক একহাতে রিকশা সামলাচ্ছে আরেক হাত গামছা দিয়ে ঢেকে রাখা। খেয়াল করে দেখলাম গামছায় ডাকা হাতটা প্লাস্টার করানো।ট্রাকের সাথে লেগে এমনটা হয়েছে জানতে পারলাম।

ভাবলাম, বাস্তবতা কতটা কঠিন। দুনিয়াটা মুষ্টিমেয় মানুষের জন্য বেহেশতখানা। অথচ নিম্ন বিত্তের কাছে জীবনের চেয়ে জীবিকার মূল্য বেশি।

সবাই এই পৃথিবীতে বেশি দিন থাকতে চায় যেকোনো মূল্যে। কিন্তু এসব মানুষের ভাবনা হয়ত মরে গেলেই বেঁচে যাই টাইপের। অথচ, আমাদের মত এসব মধ্যবিত্ত নিম্নবিত্তের জন্যই লকডাউন নামক মনুষ্যসৃষ্ট দুর্যোগ শতভাগ কার্যকর। সামনে ঈদ। এদের সবারই ভাবনা ছিলো হয়তো ঈদে পরিবারের জন্য এটা সেটা করবে। কিন্তু সেসব পরিকল্পনা এখন ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখার মত। যারা ঢাকার নিউমার্কেটের মত জায়গাগুলোতে হকার হিসেবে কাজ করে তাদের অবস্থা এখন কেমন! ভাবতেই শিহরণ জাগায়। যারা মার্কেটগুলোতে সামান্য বেতনে বিক্রয়কর্মী হিসেবে কাজ করে, দোকান না খুললে তারা বেতন পাবে? কতটা সংকটময় সময়ে থাকলে মানুষ করোনার মত প্রাণঘাতী ভাইরাস উপেক্ষা করে লকডাউনের প্রতিবাদে আন্দোলন করে, নিউ মার্কেটের এসব মানুষের আন্দোলন দেখলে তা সহজেই অনুমান করা যায়।

অথচ দেশের বড় বড় ব্যবসায়ীদের আয় কোনো অংশে কমবে না এই একডাউনে। বরং করোনাকে কেন্দ্র করে অনেকেরই আঙুল ফুলে কলাগাছ হবে। এটাই বঙ্গ দেশের স্বাভাবিক ঘটনা। অধিকন্তু লকডাউনের আগে সরকার ধনীদের আরো ধনী হওয়ার যে সুযোগ সৃষ্টি করে দিয়েছিলো তা আমরা সবাই প্রত্যক্ষ করেছি। লঞ্চের মত গণপরিবহন। যেখানে চাইলেই কম যাত্রী পরিবহন করা সম্ভব না। সেখানে সরকারের সিদ্ধান্তে ভাড়া প্রায় দ্বিগুণ করা হল। অথচ লঞ্চের ডেকে দক্ষিণ অঞ্চলের নিম্নবিত্ত মানুষই যাতায়াত করে। একদিকে তাদের আয়ের পথ রুদ্ধ, অন্যদিকে তাদের যাতায়াত খরচ বাড়িয়ে দেয়া হলো।
যেদিন নৌপরিবহন মন্ত্রী সিদ্ধান্ত নিলেন নৌযানের ভাড়া বৃদ্ধি করার ঠিক তার একদিন পরেই ঢাকায় কয়েকটা চাকরির পরীক্ষার তারিখ ছিলো। বরিশাল থেকে আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন ছোটভাইয়ের সাথে কথা হয়েছিলো। তারা ওইসব পরীক্ষার অংশগ্রহণকারী। লঞ্চের ভাড়া বৃদ্ধির কারনে তাদের অনেকেরই অংশগ্রহণ করা সম্ভব হয়নি।

যে হারে প্রতিনিয়ত করোনার প্রাদুর্ভাব বাড়ছে তাতে করে লকডাউনের মত পদক্ষেপের বিকল্প নাই।
কিন্তু করোনার আক্রমণের চেয়ে মানুষ যদি ক্ষুধায় বেশি মরে! তবে এমন লকডাউন নিরর্থক ও অপ্রত্যাশিত। দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ এসব নিম্ন মধ্যবিত্ত মানুষের জন্য বিকল্প ভাবনার পরেই তথাকথিত লকডাউনের কথা ভাবা উচিত সরকারের। দেশের সাধারণ মানুষকে মহামারী থেকে রক্ষায় সরকারের যেমন দ্বায়িত্ব রয়েছে। একইভাবে মানুষ জীবিকার জন্য যেনো জীবন না হারায় সেটাও সরকারের সমূহ দ্বায়িত্ব।

লেখকঃ এইচ এম জহিরুল ইসলাম।
সাবেক শিক্ষার্থী, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়।

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin