বরিশালে মাদকাসক্তদের আলোর পথ দেখাচ্ছে ‘দি নিউ লাইফ’

সিটি নিউজ: বরিশালে মাদকাসক্তি ও মানসিক চিকিৎসায় সফলতা অর্জন করেছে দি নিউ লাইফ নামের একটি প্রতিষ্ঠান। বরিশাল নগরীর সিএন্ডবি পুল এলাকায় অবস্থিত অত্যাধুনিক এ চিকিৎসা কেন্দ্র থেকে গত এক বছরে মাদকাসক্ত ছেরে সুস্থ জীবনে ফিরে গেছে শতাধিক ব্যক্তি।

বর্তমানে কেন্দ্রটিতে ১৫ জন ব্যক্তি চিকিৎসাধীন রয়েছে। সুস্থ হয়ে যাওয়া ব্যক্তিরা যেমন অন্ধকার থেকে আলোর পথে ফিরে এসেছে, তেমনি হাসি ফুটেছে তাদের পরিবারের মাঝে। প্রতিষ্ঠানটির চিকিৎসা ব্যবস্থা নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন চিকিৎসাপ্রাপ্ত রোগী ও তাদের স্বজন এবং প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।

সরেজমিনে সরকারি অনুমোদনপ্রাপ্ত এ কেন্দ্রটি পরিদর্শন করে দেখা যায়, রোগীদের নিবিড় পরিচর্যার মাধ্যমে চিকিৎসা প্রদান করা হচ্ছে। পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন পরিবেশে নার্স ও ষ্টাফরা রোগীদের তদারকি করছেন।

এ সময় কথা হয় প্রতিষ্ঠানটিতে চিকিৎসাধীন নগরীর বাসিন্দা জাহিদুলের সাথে। তিনি বলেন, আমি মাদক গ্রহণের ফলে শারীরিক ও মানসিকভাবে ভারসাম্যহীন হয়ে পড়েছিলাম। এর আগে অপর একটি কেন্দ্রে দুইবার চিকিৎসা নিয়েও সুস্থ হতে পারি নাই। কিন্তু নিউ লাইফ থেকে চিকিৎসা নিয়ে প্রায় এক বছর ধরে সুস্থ আছি।

কেন্দ্র থেকে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হওয়া আকাশ নামের অপর এক যুবক বলেন, ‘মাদকাসক্তির কারণে আমার বিভিন্ন ধরনের মানসিক সমস্যা তৈরি হয়েছিল। লেখাপড়া বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু এখন সুস্থ হয়ে পুনরায় লেখাপড়া করছি।

কেন্দ্রে চিকিৎসাধীন অন্যান্য রোগীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, কেন্দ্রটিতে একেক জন রোগীকে সপ্তাহে অন্তত ৩ বার করে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক পর্যবেক্ষন করে থাকেন। তাছাড়া নার্স-ব্রাদাররা প্রতিদিন ঔষধ সেবন করানোর পাশাপাশি প্রতিদিন নিয়মিত রক্তচাপ (প্রেশার) পরীক্ষা করে থাকেন। রোগীদের প্রতিদিন মেডিকেল ডায়েট চার্ট অনুযায়ী খাবার সরবরাহ করা হয়। আবার প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে খাওয়া, ঘুম, ব্যায়াম, ধর্মিয় শিক্ষাসহ ক্লাস সেশন করানো হয় বলে জানান রোগীরা।

দি নিউ লাইফ মাদকাসক্তি ও মানসিক চিকিৎসা কেন্দ্রটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক গোলাম মর্তুজা জানান, অভিজ্ঞ সাইক্রিয়াটিস্ট ও মেডিসিন বিশেষজ্ঞ এবং প্রশিক্ষিত স্টাফদের তত্ত্বাবধানে রোগীদের নিবিড় পরিচর্যার মাধ্যমে চিকিৎসা সেবা প্রদান করা হয়ে থাকে প্রতিষ্ঠানটিতে। ফলে কেন্দ্রটিতে চিকিৎসা নিতে আসা প্রতিটি রোগী খুব দ্রুত সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে যাচ্ছে। সম্ভাবনাময় তরুণ ও যুব সমাজকে মাদকের বিষাক্ত ছোবল থেকে রক্ষা করার জন্য সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে তারা এ কেন্দ্রটি প্রতিষ্ঠা করেছেন বলেও জানান তিনি।

৩০ শয্যা বিশিষ্ট কেন্দ্রটিতে রোগীদের জন্য পৃথক বিছানা, মানসম্মত খাবার, বিনোদন, চিকিৎসা সরঞ্জাম, সার্বক্ষণিক সকল রোগীদের প্রশিক্ষিত ষ্টাফ এবং সিসি ক্যামেরার মাধ্যমে মনিটরিং, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী ঔষধ প্রয়োগ করা হয়ে থাকে।

কেন্দ্রের পরিচালক (প্রশাসন) ইয়াসির আরাফাত জানান, কোন কোন মাদক নিরাময় কেন্দ্রে চিকিৎসার নামে অপচিকিৎসা করা হচ্ছে। এর ফলে রোগীরা প্রকৃত চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে এবং সুস্থ হতে পারছে না। কিন্তু দি নিউ লাইফ কেন্দ্রটিতে অভিজ্ঞ চিকিৎসকের মাধ্যমে মান সম্পন্ন ও বিজ্ঞানভিত্তিক এবং আধুনিক চিকিৎসা সেবা প্রদান করা হয়ে থাকে।

তিনি বলেন, এখানে ওষুধ প্রয়োগের পাশাপাশি রোগীদের কাউন্সেলিং, পারিবারিক কাউন্সেলিং, সাইকোথেরাপি, ধর্মীয় ও সামাজিক এবং সাইকলজিক্যাল শিক্ষামূলক ক্লাসের মাধ্যমে স্বাভাবিক জীবন যাপনে অভ্যস্ত করে তোলা হয়। সেবা মূলক মনোভাব নিয়ে প্রতিষ্ঠানটি আমরা পরিচালনা করছি, ফলে স্বল্প খরচে আমরা যে কোন ব্যক্তিকে চিকিৎসা সেবা প্রদান করছি।

বরিশাল মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক পরিতোষ কুমার কুন্ডু জানান, ‘দি নিউ লাইফ সরকার অনুমোদিত একটি আধুনিক ও মানসম্মত মাদক এবং মানসিক রোগের চিকিৎসা কেন্দ্র। দেশের যে কোনো স্থানের তুলনায় বরিশালের এ চিকিৎসা কেন্দ্রটি ব্যবস্থাপনা আধুনিক ও বিজ্ঞান ভিত্তিক চিকিৎসা নির্ভর। একজন মাদকাসক্ত ব্যক্তিকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার সকল ধরনের চিকিৎসা পদ্ধতি এখানে রয়েছে বলেও জানান তিনি।

তিনি আরো বলেন, মাদকাসক্তি নির্মূলে নিউ লাইফ প্রতিষ্ঠানটি একটি যুগোপযোগী উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এ প্রতিষ্ঠানটির যেকোনো ভালো কাজে আমরা সহযোগিতা করবো। মাদকমুক্ত ও স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে এবং সমাজের বিভিন্ন সামাজিক অপরাধ কমিয়ে আনতে মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসার বিকল্প নেই।

বরিশাল জেলা প্রশাসক জসীম উদ্দীন হায়দার সাম্প্রতি নিউ লাইফের উদ্যোগে দরিদ্রদের পোষাক ও শীতবস্র প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথীর বক্তৃতায় বলেন, মাদক একটি সামাজিক সমস্যা। দি নিউ লাইফ মাদকাসক্তি নিরসনের পাশাপাশি বরিশালে বিভিন্ন সামাজিক কাজ করছে। আমি ভালো কাজের জন্য তাদের পুরস্কৃত করবো।

সম্প্রতি বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার (দক্ষিণ) মোখতার হোসেন- পিপিএম (সেবা), সহকারী পুলিশ কমিশনার মো. রাসেল আহমেদ, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক পরিতোষ কুমার কুন্ডুসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা নিরাময় কেন্দ্রটি পৃথকভাবে পরিদর্শন করে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তারা সেবার মান অব্যাহত রেখে কার্যক্রম চালিয়ে যেতে প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষকে নির্দেশনা প্রদান করেন এবং সহযোগিতার আশ্বাস প্রদান করেন।

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin