বরিশালে ৬৬৪ হাসপাতাল-ডায়াগনস্টিক সেন্টারের লাইসেন্স নেই

সিটি নিউজ ডেস্ক: বরিশাল বিভাগ জুড়ে ভুয়া ডাক্তার, টেকনোলজিস্ট, মানহীন মেশিন সম্বলিত ল্যাব, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই প্যাথলজির ভুয়া রিপোর্ট প্রদানসহ দালাল নির্ভর ব্যক্তিমালিকানাধীন ক্লিনিক-হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের ছড়াছড়ি।

এসবের খপ্পরে পড়ে গ্রামাঞ্চল ও শহরতলী থেকে আসা রোগীরা রোগ থেকে মুক্তি না পেয়ে মোটা অঙ্কের টেস্ট ও ক্লিনিক বিল পরিশোধ করে আর্থিকভাবে সর্বস্বান্ত হচ্ছেন।

বরিশাল বিভাগীয় স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী বরিশাল বিভাগের ছয় জেলায় ব্যক্তিমালিকানাধীন ৯৬১টি ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ক্লিনিক- হাসপাতাল রয়েছে। এর মধ্যে ৭০১টি ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ক্লিনিক-হাসপাতাল রয়েছে ২৬০টি। মোট ৭০১টি ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মধ্যে লাইন্সেস নেই ৪৯২টির আর ২৬০টি ক্লিনিক-হাসপাতালের মধ্যে লাইন্সেস নেই ১৭২টির।

ডায়াগনস্টিক সেন্টারের লাইসেন্স আছে এমন সংখ্যা হলো ২০৯টি। তবে লাইসেন্স প্রাপ্তির অপেক্ষায় রয়েছে ৫৬টি, লাইন্সেস পেতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পরিদর্শনের অপেক্ষায় রয়েছে ৬৪টি এবং লাইসেন্সের জন্য আবেদন করেছে ৭১টি ডায়াগনস্টিক সেন্টার কর্তৃপক্ষ।

এছাড়া লাইন্সেস অনিষ্পাদিত অবস্থায় রয়েছে ১৬৮টি এবং অসম্পূর্ণ অবস্থায় রয়েছে ১৩৩টি ডায়াগনস্টিক সেন্টারের লাইন্সেস।

বিভাগের ছয় জেলায় ২৬০টি প্রাইভেট ক্লিনিক-হাসপাতাল রয়েছে। এর মধ্যে লাইন্সেস রয়েছে মাত্র ৮৮টির। আর লাইসেন্স প্রাপ্তির অপেক্ষায় রয়েছে ২২টি, লাইসেন্স পেতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পরিদর্শনের অপেক্ষায় রয়েছে ১৩টি, এবং লাইসেন্সের জন্য আবেদন করেছে ২০টি।

সরেজমিনে দেখা গেছে, নগরীর সদর রোড, গীর্জা মহল্লা মোড়, আগরপুর রোড, কাকলির মোড়, বাটারগলি, বিবির পুকুর পাড়, অশ্বিনী কুমার হল চত্বর, শের-ই বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও বরিশাল জেনারেল হাসপাতালের সামনে গেলেই চোখে পড়বে দালাল চক্রের দৌরাত্ম্য। নির্দিষ্ট পার্সেন্টেজের বিনিময়ে রোগী ভাগিয়ে নেয়ার তুমুল প্রতিযোগিতা চলে দালালদের মধ্যে। দালালরা ওত পেতে থাকে নগরীর রুপাতলী, নথু্ল্লাবাদ বাসটার্মিনাল ও লঞ্চ টার্মিনালে বিভিন্ন জেলা-উপজেলা শহর থেকে উন্নত চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের জন্য। রোগীদের দালালরা তাদের পছন্দের ডাক্তার ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নিয়ে গিয়ে অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে।

ভুক্তভোগী মো. কাওছার হোসেন জানান, তার মাকে নিয়ে ডাক্তার দেখে নগরীর বাটার গলিতে এলে দালালের খপ্পরে পড়ে এক ভুয়া ডাক্তারের শরণাপন্ন হন। প্রথমে দালালরা বলে হিউম্যান কেয়ারে মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ও শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ডাক্তার ফয়সাল বসেন। ডাক্তার দেখানো শেষে প্রেসক্রিপশনের প্যাডে দেখলাম কোথায় শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল কোনো পদবী লেখা নেই।

বরিশাল জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. জিয়াউর রহমান বার্তা২৪.কম-কে জানান, জেলা প্রশাসনের মোবাইল কোর্ট অভিযানে দেখা গেছে, কিছু কিছু ডায়াগনস্টিক সেন্টারে কোনোরকম পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই ডাক্তারদের জাল স্বাক্ষর ব্যবহার করে বিভিন্ন প্রকার এক্সরে, প্যাথলজি প্রভৃতি রিপোর্ট দেওয়া হচ্ছে।

এরইমধ্যে জেলা প্রশাসক এসএম অজিয়র রহমানের নির্দেশনায় নগরীর কয়েকটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে মোবাইল কোর্ট অভিযান চালানো হয়েছে। ২২ জুলাই নগরীর জর্ডান রোডে দি সেন্ট্রাল মেডিকেল সার্ভিসেস ও আগরপুর রোডে দি মুন মেডিকেল সার্ভিসেস সেন্টারে অভিযান চালিয়ে জড়িতদের ৭ জনকে ৩ ও ৬ মাসের কারাদণ্ডসহ প্রতিষ্ঠান দুটি সিলগালা করে দেয় প্রশাসন।

জনস্বার্থে ও সরকারের নির্দেশনা মোতাবেক জেলা প্রশাসক এসএম অজিয়র রহমানের নির্দেশনায় এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে বলেও জানান এই ম্যাজিস্ট্রেট।

বরিশাল বিভাগীয় স্বাস্থ্য বিভাগের সহকারী পরিচালক ডা শ্যামল কৃষ্ণ মন্ডল বার্তা২৪.কম-কে জানান, ব্যক্তিমালিকানাধীন ডায়াগনস্টিক ও ক্লিনিক হাসপাতালের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। তবে এসবের লাইন্সেস প্রাপ্তির কার্যক্রম একটি চলমান প্রক্রিয়া।

বেসরকারি পর্যায়ে হাসপাতাল, ক্লিনিক, ল্যাব ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের বৈধতার জন্য বিভিন্ন কর্তৃপক্ষের অনুমোদন প্রয়োজন। এছাড়া স্বাস্থ্য বিভাগ থেকে তাদের লাইসেন্স পেতে হলে অনলাইনে আবেদন করতে হয়। সেই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে কেন্দ্রীয়ভাবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সবকিছু যাচাই-বাছাই করে লাইসেন্স দেয়।

বরিশাল সিটি করপোরেশনের দুই সদস্য বিশিষ্ট কমিটিসহ বিভাগের ছয় জেলায় বেসরকারি ডায়াগনস্টিক ও ক্লিনিক-হাসপাতালগুলোর সবকিছু যাচাই-বাছাই করতে জুলাইয়ের দ্বিতীয় সপ্তাহে সিভিল সার্জনদের প্রধান করে কমিটি গঠন করা হয়েছে।

কমিটির কাছ থেকে হালনাগাদ তথ্য পেলে অনুমোদনবিহীন ও অবৈধ প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে নিয়মানুযায়ী আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে বলেও জানান এই সহকারী পরিচালক।

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin