মাহবুব উদ্দিন আহমদ, বীর বিক্রম অবিস্মরণীয় গার্ড অব অনার

মাহবুব উদ্দিন আহমদ, বীর বিক্রম একাত্তরে ঝিনাইদহ মহকুমার পুলিশপ্রধান ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি যোগ দেন সশস্ত্র সংগ্রামে। ১৭ এপ্রিল প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রিসভার শপথ অনুষ্ঠানে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতিকে গার্ড অব অনার দেওয়ার দায়িত্ব পালন করেছিলেন তিনি। প্রথম আলোর কাছে বর্ণনা করেছেন সেদিনের স্মৃতি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আহমেদ জায়িফ

১৯৭১ সালে তাজউদ্দীন আহমদের সঙ্গে আপনার কোন দিন এবং কোথায় প্রথম দেখা হয়?

উত্তর: ২৭ মার্চ বেলা ১১টায় তাজউদ্দীন আহমদ ও ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম ঝিনাইদহ এসে পৌঁছান। তাঁদের সঙ্গে আমার পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয় মোহাম্মদ আলী ও শওকত আলী নামে। আমিও নিজের পরিচয় দিই আবদুল আলী বলে। গোপনীয়তার জন্য এই ছদ্মনাম ব্যবহার করা হয়েছিল।

এ সময় তাজউদ্দীন আহমদের সঙ্গে কী কথা হয় এবং তিনি আপনাকে কোনো দায়িত্ব দিয়েছিলেন কি?

উত্তর: তাঁরা তাঁদের ভারত যাওয়ার পরিকল্পনার কথা আমাকে জানান। ২৫ মার্চ রাত থেকেই ঝিনাইদহে প্রতিরোধযুদ্ধ শুরু হয়েছিল। প্রধান সংগঠক হিসেবে স্থানীয় সংগ্রাম কমিটি আমার কর্তৃত্ব গ্রহণ করে। আমার ওপর তাই এমএনএ আজিজ ভাইয়ের অগাধ বিশ্বাস ছিল। তিনিও আমাকে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিতে বললেন। বেলা একটার দিকে আমার বাল্যবন্ধু ও মেহেরপুরের তৎকালীন এসডিও তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরীকে খবরটা জানালাম। তৌফিক ২৫ মার্চের পরপরই বিএসএফ ও পশ্চিম বাংলার নদীয় জেলার প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করে। তৌফিক তাৎক্ষণিকভাবে ‘আওয়ামী লীগের দুজন ভিভিআইপি বর্ডার পার হবেন’ এমন তথ্য তাদের জানিয়ে দেয়। আমি একটি জিপে করে তাজউদ্দীন ও আমীর-উল ইসলামকে নিয়ে চুয়াডাঙ্গার পথে রওনা হই। চুয়াডাঙ্গার সার্কিট হাউসে মেজর আবু ওসমান চৌধুরীর যুদ্ধকালীন হেডকোয়ার্টারে পৌঁছাতে বিকেল পাঁচটা বেজে যায়। ইতিমধ্যে তৌফিকও মেহেরপুর থেকে চুয়াডাঙ্গায় চলে আসে। তাজউদ্দীন ও আমীর-উল ইসলাম গাড়িতেই বসা ছিলেন। মেজর ওসমান গাড়ির জানালা দিয়ে মাথা ঢুকিয়ে তাঁদের সঙ্গে কিছুক্ষণ আলাপ করেন। কয়েক মিনিটের মাথায় তৌফিকের গাড়ি সামনে থেকে চলা শুরু করে। আমাদের গাড়িও পিছু নেয়। চ্যাংখালী বর্ডারে পৌঁছাতে সন্ধ্যা হয়ে যায়। চ্যাংখালী বিওপিতে ক্যাপ্টেন মহাপাত্র তাজউদ্দীন ও আমীর-উল ইসলামকে ভিআইপির মর্যাদায় গ্রহণ করেন।

তাজউদ্দীন আহমদ ভারতে যাওয়ার পর সরকার গঠন করেন। এ খবর আপনি কোন দিন পান?

উত্তর: ১০ এপ্রিল যখন সরকার গঠিত হয়, তখন আমরা যশোর ফ্রন্টে পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে ক্যান্টনমেন্টে ঘেরাও করে রেখেছি। ভারত থেকে বড় রকম হাতিয়ার পাওয়ার আশায় দিন গুনছি। এপ্রিলের মাঝামাঝি খবর এল, চুয়াডাঙ্গায় নবগঠিত সরকার শপথ গ্রহণ করবে। কিন্তু সেই তথ্য পাকিস্তানি বাহিনীর কাছে পৌঁছে যাওয়ায় ১৫ এপ্রিল পাকিস্তানি বিমান ঝিনাইদহ ও চুয়াডাঙ্গায় হামলা করে। তখন সেই পরিকল্পনা বাতিল হয়ে যায়। হামলায় পিছু হটে আমরা অবস্থান নিই ভারতে।

বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি ও মন্ত্রিপরিষদের সদস্যরা মুক্তাঞ্চল মুজিবনগরে শপথ নেন। এ আয়োজনে আপনি কখন কীভাবে সম্পৃক্ত হন?

উত্তর: ১৭ এপ্রিল সকালে তৌফিকের কাছে জানতে পারলাম, বৈদ্যনাথতলায় একটি অনুষ্ঠান হবে। এখানে নেতৃবৃন্দ আসবেন। প্রবাসে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ সরকারের শপথ গ্রহণ হবে। তৌফিক আর আমি ভারতীয় সীমান্তচৌকি থেকে গাড়িতে করে রওনা হয়ে মেহেরপুরের ওপর দিয়ে সকাল সাড়ে ১০টায় ভবেরপাড়া সীমানায় বৈদ্যনাথতলায় এসে পৌঁছাই। আমাদের দুজনের সঙ্গেই কয়েকজন করে সশস্ত্র মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। মেহেরপুর থেকে ১৭-১৮ মাইলের মাথায় এই সীমান্তচৌকি। বাংলাদেশের ভূখণ্ড পাহারা দেওয়ার জন্য চৌকিতে অবস্থান করছিলেন জনা কয়েক ইপিআর। পাকা ভিতের ওপর টিনের ঘর, চারদিকে ইটের দেয়াল। সামনে ফ্ল্যাগস্ট্যান্ডে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা বেঁধে রাখা। আম্রকুঞ্জের চারদিকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে ভারতীয় কমান্ডো বাহিনীর কিছু সদস্য। হঠাৎ করেই ভোস ভোস করে হর্ন বাজিয়ে অনেক কালো গাড়ি এগিয়ে এল। সাংবাদিক, আওয়ামী নেতৃবৃন্দ, ছাত্র, শ্রমিক, কৃষক, জনতা নেমে এল। মঞ্চটি বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের একটা ছোট এনক্লেভের মধ্যে।

অনুষ্ঠানে আপনার দায়িত্ব কী ছিল?

উত্তর: তৌফিক তখন সবাইকে অভ্যর্থনা জানাতে ব্যস্ত। এক ফাঁকে আমাকে ডেকে বলল, মেজর আবু ওসমান চৌধুরী ভাইকে সদলবলে আসতে বলেছিলাম। শপথ অনুষ্ঠানে তাঁদের গার্ড অব অনার দেওয়ার কথা। তখনো না আসায় কিছুক্ষণ ভেবে আমাকেই গার্ড অব অনার দেওয়ার প্রস্তাব করলেন। আমি বললাম, কোনো অসুবিধা নেই। আমার সঙ্গে যে সৈনিকেরা আছেন, তাঁদের দিয়ে গার্ড অব অনার দেব। আমি আমার সাথি সৈনিক আর উপস্থিত কজন আনসার ডেকে একত্র করে দাঁড় করিয়ে সালাম দেওয়ার জন্য তৈরি করলাম।

শপথ নেওয়ার জন্য সবাই দাঁড়ালেন আমাদের সামনের মঞ্চে। উচ্চারিত হলো শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি, সৈয়দ নজরুল ইসলাম উপরাষ্ট্রপতি। বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ, মনসুর আলী অর্থমন্ত্রী, কামারুজ্জামান স্বরাষ্ট্র ও ত্রাণমন্ত্রী, খন্দকার মোশতাক আহমদ বিদেশমন্ত্রী। তাঁদের শপথ পাঠ করালেন এমএনএ অধ্যাপক ইউসুফ আলী।

এবার গার্ড অব অনারের পালা। সৈয়দ নজরুল ইসলাম বাদে বাকি সবাই মঞ্চ থেকে নেমে গেলেন। পাশে মঞ্চের ওপর দাঁড়িয়ে রইলেন খাকি পোশাক পরিহিত কর্নেল ওসমানী। তাৎক্ষণিকভাবে তৈরি হওয়া জওয়ানদের কমান্ড করলাম, ‘অ্যাটেনশন’। পরবর্তী নির্দেশ সোলডার আর্মস। তারপর উচ্চকিত কণ্ঠে সকল পেশি বিদীর্ণ করে চিৎকার করে কমান্ড দিলাম প্রেজেন্ট আর্মস। সবাই রাইফেলগুলো বুকের ছয় ইঞ্চি সামনে আকাশের দিকে নল তুলে সামরিক কায়দায় অভিবাদন করে ঋজু ও অনড় হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। আমার ডান হাত উঠে এল স্যালুটের ভঙ্গিতে মাথার ডান পাশে। জাতীয় সংগীত গেয়ে উঠল একদল তরুণ-তরুণী।

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin