লঞ্চ শিল্প বাঁচাতে ৬ দফা দাবি না মানলে নতুন কর্মসূচি

মহামারির করোনার কারণে ও তার সংক্রমণ রোধে লকডাউনসহ নানা কর্মসূচিতে বেহাল লঞ্চ সেক্টর। দুই দফায় প্রায় ৯ মাস ছিল লঞ্চ চলাচল বন্ধ। আর এ কারণে হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েছে লঞ্চ মালিকরা। তার মধ্যে ব্যাংক ঋণের কারণে দিশাহারা হয়ে পড়েছে তারা।

লঞ্চ সার্ভিস টিকিয়ে রাখতে সরকারের প্রতি জোর দাবি জানিয়েছেন তারা। দাখিল করেছে ৬ দফা দাবি। আগামী ২৪ মে তারিখের মধ্যে লঞ্চ চলাচল শুরু না হলে নতুন কর্মসূচি দেয়া কথা জানিয়েছেন বাংলাদেশ নৌ চলাচল (যাত্রী পরিবহন) সংস্থার সহ সভাপতি ও সুন্দরবন নেভিগেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাইদুর রহমান রিন্টু।

এদিকে সরকারির নির্দেশনা না পাওয়া পর্যন্ত লঞ্চ চলাচল বন্ধ থাকবে বলে জানিয়েছে বিআইডব্লিউটিএ।

জানা গেছে, ঢাকা-বরিশাল নৌ-রুট দেশের সব চেয়ে বড় নৌ রুট। স্বাভাবিকভাবেই এ রুট কে কেন্দ্র করে যাত্রী সেবার জন্য যুক্ত হয়েছে বিলাস বহুল সব লঞ্চ। একক দৃষ্টিতে শুধু লঞ্চ ব্যবসায়ই নয় দিনে দিনে এটি একটি শিল্পতে রূপ নিয়েছে। যার ফলশ্রুতিতে বরিশালে গড়ে উঠেছে বেশ কয়েকটি জাহাজ নির্মাণ প্রতিষ্ঠান।

এসব অত্যাধুনিক নৌযান এসব ডক ইয়ার্ডেই তৈরি করা হয়েছে। এই শিল্পের সঙ্গে জড়িয়ে হাজার হাজার শ্রমিক জীবিকা নির্বাহ করছে। বর্তমানে এই রুটে ৮ কোম্পানির ২৩টি লঞ্চ চলাচল করছে। প্রায় সবগুলোই ৩ থেকে ৪ তলা বিশিষ্ট।

অত্যাধুনিক এই এক একটি লঞ্চ তৈরি করতে ব্যয় হয় ২০ থেকে ৩০ কোটি টাকা। যার মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি থাকে ব্যাংক ঋণ। মাসিক ও ত্রৈমাসিক হিসাবে কিস্তি পরিশোধের চুক্তিতে উচ্চ সুদে সরকারি বেসরকারি ব্যাংক থেকে এই ঋণ গ্রহণ করে থাকে মালিকরা।

ঋণের ধরণ হিসাবে প্রায় প্রত্যেক লঞ্চ মালিককে মাসে ৪০ লাখ থেকে কোটি টাকা পর্যন্ত কিস্তি পরিশোধ করতে হয়। অথচ দীর্ঘ সময় ধরে বন্ধ রয়েছে উপার্জনের বাহন লঞ্চ চলাচল। ব্যাংক তথা ঋণ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো কিস্তি স্থগিতও করেনি বা সুদের হারও কমায়নি। এমন অবস্থায় এক কথায় দিশেহারা সব লঞ্চ মালিকরা।

তথ্য মতে, করোনার শুরু থেকে এখন পর্যন্ত মোট ৭ মাস সরকারি নির্দেশে লঞ্চ চলাচল বন্ধ রয়েছে। স্বাভাবিক কারণেই বন্ধ রয়েছে উপার্জন। কিন্তু নিয়ম মেনে যথারীতি পরিশোধ করতে হয়েছে ভ্যাট ট্যাক্স। বাদ যায়নি যাত্রী কল্যাণ ফান্ডে টাকা প্রদান। শ্রমিকদের বেতন বোনাসও পরিশোধ করেছেন মানবিক বিবেচনায়।

এদিকে গত শুক্রবার লঞ্চ মালিক সমিতির সভা থেকে ৬ দফা দাবি তোলা হয়। দাবিগুলো হচ্ছে ব্যাংক ঋণের সুদ ৬ মাসের জন্য মওকুফ করা, লঞ্চ চলাচলের পাশাপাশি প্রণোদনার অর্থ দ্রুত মালিকদের কাছে বণ্টন করা, অগ্রিম প্রদত্ত ছয় মাসের ট্যাক্স আনুপাতিক হারে মওকুফ করা, বিআইডব্লিউটিএর বিভিন্ন চার্জ ৬ মাসের জন্য মওকুফ করা ও নৌ পরিবহন অধিদপ্তরের ৬ মাসের সার্ভে ফি মওকুফ করা। আর এই দাবি নিয়ে শনিবার সংবাদ সম্মেলন করে লঞ্চ মালিকরা।

বাংলাদেশ নৌ চলাচল (যাত্রী পরিবহন) সংস্থার সহ সভাপতি ও সুন্দরবন নেভিগেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাইদুর রহমান রিন্টু বলেন, সরকার করোনায় ক্ষতিগ্রস্ত অনেক ব্যবসায় ও শিল্প প্রতিষ্ঠান কে বিভিন্ন ধরনের প্রণোদনা দিয়েছে কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমরা লঞ্চ মালিকরা বঞ্চিত হয়েছি।

তিনি বলেন, প্রত্যেক লঞ্চ মালিকের শত কোটি টাকা পর্যন্ত ব্যাংক ঋণ রয়েছে। যাদেরকে নির্দিষ্ট হারে এসব ঋণ পরিশোধ করতে হয়। কিন্তু উপার্জনই নেই। কি করে সে টাকা পরিশোধ করবে। তাই আমরা ব্যাংক ঋণের সুদ ৬ মাসের জন্য মওকুফ করা দাবি জানিয়েছি। তা ছাড়া বিআইডব্লিউটিএর বিভিন্ন চার্জ মওকুফ করার দাবীসহ ৬ দফা দাবি জানানো হয়েছে। আমরা আশা করি আগামী ২৪ মে এর মধ্যে আমাদের দাবিগুলো পূরণসহ লঞ্চ চলাচলের অনুমোদন দেয়া হবে।

অপর লঞ্চ মালিক মেসার্স সালমা শিপিং ও কীর্তনখোলা লঞ্চের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মঞ্জুরুল আহসান ফেরদৌস বলেন, করোনার কারণে আমরা ৯ মাস লঞ্চ চালাতে পারিনি। আমরা সরকারের কাছে প্রণোদনা চাই না। স্বাস্থ্যবিধি মেনে আমাদের লঞ্চ চলাচলের অনুমতি দিন। আমরা দেখেছি ঈদে সময় একটি মাইক্রেবাসে ১৭ জন মানুষ যাচ্ছে। ফেরিতে মানুষের ভিড়ে মানুষ মারা যাচ্ছে। কিন্তু লঞ্চ চলাচল করলে এই সমস্যা হতো না। কারণে আমাদের প্রায় ৮শ লঞ্চ রয়েছে, এই লঞ্চ চলাচল করলে লাখ লাখ মানুষ স্বাস্থ্য বিধি রক্ষা করেই গন্তব্যে পৌঁছাতে পারতো।

তিনি বলেন, লঞ্চ ব্যবসায় মানেই ঋণের বোঝা। আমরা কোটি কোটি টাকা ঋণ নিয়ে লঞ্চ তৈরি করে যাত্রীদের মনোরম সেবা দিয়ে আসছি। কিন্তু করোনার সময় আমাদের দুঃসময়ে সরকার পাশে দাঁড়ায়নি। ফলে ঋণের বোঝায় আমাদের ঘুম হারাম। আমাদের ঋণের কিস্তি দিতে হচ্ছে, শত শত স্টাফদের বেতন, ভ্যাট ট্যাক্স সবই দিতে হয়েছে। একটি জায়গা থেকেও মাফ পাইনি। তাই আমাদের দিকে সরকার না তাকালে আমরা নিশ্চিত দেউলিয়া হয়ে যাব। আমাদের একটাই দাবি স্বল্প সুদে দ্রুত ঋণের ব্যবস্থা করা হোক পাশাপাশি লঞ্চ চলাচলের অনুমতি দেওয়া হোক।

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin