‘অটো ড্রেন ক্লিনার’জনবল ছাড়াই পরিষ্কার করবে শহরের ড্রেন

সিটি নিউজ ডেস্ক: প্রায়ই শুনতে পাওয়া ড্রেনেজ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার খবর। যার ফলে সৃষ্টি হচ্ছে জলাবদ্ধতার, স্থবির হয়ে পড়ছে পয়ঃনিষ্কাশন প্রণালী।

এছাড়া জায়গায় জায়গায় ময়লা আটকে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি হয়ে বর্জ্যসহ ড্রেনের পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে রাস্তাঘাট। যা মানুষের চলাচলসহ স্বাভাবিক জীবনধারণকেও ব্যহত করছে। আবার আটকে যাওয়া রোধসহ ড্রেনেজ ব্যবস্থাকে সচল করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের।
ড্রেনেজ ব্যবস্থা সচল না থাকলে যেমন নাগরিক জীবনে সৃষ্ট হয় নানান ভোগান্তির, তেমনি আটকে থাকা পানিতে ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়াসহ নানান মশা ও জীবানুর জন্ম হয়। যা থেকে নানান ব্যধিতে আক্রান্ত হয়ে থাকেন সাধারণ মানুষ। এদিকে ড্রেন দিয়ে ময়লা আবর্জনাসহ পানি সরাসরি খালে ও নদীতে গেলে সেখানকার পানিও দুষিত হচ্ছে।

তাই এসব কথা বিবেচনা করে, সমস্যাগুলো সমাধানে “অটো ড্রেন ক্লিনার” উদ্ভাবন করেছেন বরিশাল জেলার বাবুগঞ্জ উপজেলার মাধবপাশা ইউনিয়নের মধ্যম পাংশা গ্রামের বাসিন্দা শরীফ বাড়ির ওবায়েদুল ইসলাম। যিনি বাবুগঞ্জ পাইলট মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের কারিগরি বিভাগের জেনারেল মেকানিক্স ট্রেড থেকে এসএসসি ভোকেশনাল এবং খুলনার ম্যানগ্রোভ ইন্সটিটিউট অব সাইন্স এন্ড টেকনোলজি থেকে ডিপ্লোমা ইন মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং শেষ করেছেন। বাবা- মায়ের বিচ্ছেদের কারনে ছোটবেলা থেকেই মায়ের সাথে শরীফ বাড়ির মামা বাড়িতে থাকেন তিনি। যার লেখাপড়াসহ সবকিছুর ভরণ-পোষণ দিয়েছেন মামারা। আর মামা অবসরপ্রাপ্ত সেনাসদস্য আব্দুল জলিল শরীফের উৎসাহেই অটো ড্রেন ক্লিনার প্রযুক্তি উদ্ভাবনে সাহস পেয়েছেন ওবায়েদুল। এখন পর্যন্ত ১৫ হাজার টাকা ব্যয়ে এক বছর ধরে পর্যায়ক্রমে অটো ড্রেন ক্লিনার প্রযুক্তি ডেভেলপের জন্য কাজ করেছেন বলে জানান তিনি।

তিনি আরো জানান, লেখাপড়ার সুবাদে খুলনা শহরে দীর্ঘদিন ছিলেন। সেখানে তিনি বহু লোক দিয়ে ড্রেন পরিষ্কার করাতে দেখেছেন নগর কর্তৃপক্ষকে। আর ড্রেনের সেই ময়লাও তুলে সড়ক বা বিভিন্ন স্থাপনার সামনে রাখা হয়। এতে করে মশা-মাছিসহ বিভিন্ন মাধ্যমে রোগ-জীবানু ছড়িয়ে পড়ার শঙ্কা ছিল সবসময়। অর্থাৎ একটি ভালো কাজ করতে গিয়ে পদ্বতিগত কারণে নগরবাসীর উপকারের চেয়ে ক্ষতি হওয়ার সম্ভবনা বেশি থাকছে।

তিনি জানান, “অটো ড্রেন ক্লিনার” হচ্ছে একটি শহরের ড্রেন পরিচ্ছন্ন রাখার মডেল প্রযুক্তি। এটি বৃহৎ পরিসরে বাস্তবায়ন হলে নগর কর্তৃপক্ষ তাদের ব্যয় কমিয়ে জনবল ছাড়াই সময় মত প্রতিদিন ড্রেন পরিস্কার রাখতে পারবে স্বয়ংক্রিয়ভাবে।

ওবায়েদুল জানান, তার উদ্ভাবিত এ প্রযুক্তির সাহায্যে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ড্রেন পরিষ্কার যেমন হবে, তেমনি ড্রেনের ভেতরে থাকা ময়লা অটোমেটিক পানি থেকে আলাদা হয়ে নির্ধারিত স্থানে চলে যাবে। ফলে যদি ওই ড্রেনের সাথে খাল বা নদীর সংযোগ থাকে তাহলে সেখানকার পানি দুষিত হওয়া থেকে রক্ষা পাবে। আর ড্রেন পরিষ্কার রাখা থেকে শুরু করে ময়লা আলাদাকরণ এ কার্যক্রমে কোন জনবলের প্রয়োজন হবে না। সেইসাথে বিদ্যুৎনির্ভর এই প্রকল্পটি সৌর বিদ্যুতের ব্যবহার করে চালানোও সম্ভব বলে জানান উদ্ভাবক ওবায়েদুল।

তিনি বলেন, অটো ড্রেন ক্লিনার মূলত একটি নির্ধারিত সিস্টেমের ওপর তৈরি। যা সেন্সর নির্ভর এবং মাইক্রো প্রসেসর নিয়ন্ত্রিত। এই পদ্বতিতে সেন্সর ড্রেনের ময়লা-আবর্জনার স্তর শনাক্ত করবে এবং ড্রেনের ভেতর ময়লা-আবর্জনা আটকে জমাট বেধে পানির প্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করলে তা সিস্টেমকে অবহিত করবে। সেন্সরের দেয়া তথ্যানুযাযী সিস্টেম স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রেসার পাম্পের সাহায্যে ড্রেনের ভেতরে পানির গতি বাড়াবে এবং ময়লা-আবর্জনার স্তর ভেঙে দিয়ে প্রবাহ ঠিক রাখবে। এভাবে একটি ড্রেনের ভেতরের বিভিন্ন স্থানে দুরত্ব ও অবস্থান ভেদে বসানো সেন্সর স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাজ করবে এবং ড্রেনকে পরিষ্কার রাখবে।

আর ড্রেনের সংযোগ যদি নদী-খালের সাথে থাকে তাহলে সর্বশেষ সেন্সরটি থাকবে ড্রেনের বর্হিগমন অংশে। এতে করে অতিরিক্ত জোয়ার বা প্লাবনের সময় যদি পয়েন্টে। সেখানে ড্রেনের পানি নদী/খালে নির্গমন না হয়ে যদি উল্টো প্রবেশ করে, তাহলে বর্হিগমন পয়েন্টের সেন্সর সক্রিয় হয়ে নদী বা খালের পানির স্তর ড্রেনের পানির স্তরের নিচে না নেমে আসা অবধি পুরো প্রক্রিয়াটি নিস্ক্রিয় করে রাখবে।

এই উদ্ভাবক তার মডেলের বরাত দিয়ে বলেন, শহরের ড্রেনগুলো দিয়ে শুধু দূষিত পানিই নয়, এর সাথে বাসা-বাড়ির ময়লা-আবর্জনা যাচ্ছে। সেসব ময়লা-আবর্জনা ড্রেনের পানির স্বাভাবিক গতির সাথে মিশে একটি নির্ধারিত দূরত্বে গিয়ে জমাট বেঁধে যায়। কারণ ড্রেনের সবজায়গায় পানির গতি এক থাকতে পারছে না। এ কারণে সেই ড্রেনটির পরিমাপের ওপর নির্ভর করে সেন্সর স্থাপনের কাজ। ড্রেনের ময়লা-আবর্জনা যদি প্রথম স্তর পর্যন্ত জমাট বাধে তাহলে সেন্সরের সিগন্যালের মাধ্যমে প্রথম প্রেসার পাম্পটি চালু হয়ে ময়লা-আবর্জনার জমাট বাধা অংশের ওপর প্রবল গতিতে পানি ছুড়ে তা ভেঙে দিবে। ড্রেনের স্বাভাবিক পানি ও প্রেসার পাম্পের ছোড়া পানি মিলে ময়লা-আবর্জনা নির্গমন মুখের দিকে স্রোতে ভেসে যাবে। পানি প্রবাহের গতি কমে গিয়ে যেখানে দ্বিতীয় স্তর গড়ে তুলবে সেখানে স্বয়ংক্রিয়ভাবে দ্বিতীয় সেন্সরের সিগন্যালে প্রেসার পাম্প চালু হয়ে পানি প্রবাহ বাড়িয়ে দিবে। এভাবে ড্রেনের বর্হিগমন পয়েন্ট পর্যন্ত ময়লা আবর্জনা পানি প্রবাহের মাধ্যমে পৌঁছে দিবে সেন্সর ও প্রেসার পাম্প।

বর্হিগমনে বিশেষ পদ্ধতিতে ছাকনি স্থাপন করা থাকবে যাতে ময়লা-আবর্জনা আটকে থাকবে আর পানি নদী/খালে পতিত হবে। এতে করে নদী বা খালে ময়লা-আবর্জনা যেমন পরবে না, তেমনি দূষণের হাত থেকেও রক্ষা পাবে।

তিনি বলেন, প্রেসার পাম্প ও সেন্সর চালু রাখতে বিদ্যুতের প্রয়োজন হবে। সেক্ষেত্রে সৌর প্যানেলে এগুলোর সবগুলো চালনা করা সম্ভব। এছাড়া প্রেসার পাম্পের জন্য পানি সরবারহ করতে যে পানি সরবরাহ করতে হবে, তাওনদী ব্খালের তলদেশ থেকে পাইপের সাহায্যে আনা সম্ভব। এজন্য নদীর নিম্নাঞ্চল বা তলদেশের সমান গভীরতায় কুপ তৈরি করে পাইপের সাহায্যে অটোমেটিক পানি আনা সম্ভব। যেখান থেকে পানি বিভিন্ন ট্যাংকেও নেয়া সম্ভব।

ওবায়েদুল ইসলাম বলেন, বছর খানেক আগে একদিন দেখি ড্রেনের ময়লা পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা তুলে শহরের রাস্তায় উন্মুক্ত স্থানে স্থানে রেখে যাচ্ছেন। সেই পথ দিয়ে রিকশায় করে এক যাত্রী যাচ্ছিলেন। তিনি দুর্ঘটনার শিকার হয়ে পড়ে গেলেন ড্রেন থেকে তোলা ময়লা-আবর্জনার মধ্যে। তখনই মাথায় চিন্তা এলো একটি শহরের প্রাণ ড্রেন ব্যবস্থা কিভাবে আধুনিকায়ন করা যায়।

মা ছালেহা বেগম ও মামা অবসরপ্রাপ্ত সেনা সদস্য আব্দুল জলিল শরীফ ওবায়েদুল ইসলামের সাফল্য কামনা করেছেন।

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin