পৌরসভার সাবেক চেয়ারম্যান আলহাজ্ব গোলাম মাওলা’র জীবনী

সিটি নিউজ ডেস্ক: বরিশাল বিভাগের আলোকিত কৃর্তি সন্তান. বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির সাবেক প্রেসিডিয়াম সদস্য. বরিশাল পৌরসভার সাবেক চেয়ারম্যান. বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-চলাচল যাত্রী পরিবহন সংস্থার সাবেক চেয়ারম্যান. বাংলাদেশ নৌযান মালিকদের প্রিয় ব্যক্তিত্ব. সমাজ সেবক. শিক্ষা অনুরাগী. বিশিষ্ট শিল্পপতি. সফল রাজনীতিবিদ এবং সুরভী গ্রপ অব কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, আধুনিক বিলাস বহুল এবং যাত্রী সুবিধা সম্বলিত দক্ষিণ অঞ্চলের নৌ পরিবহন ব্যবসার পথিকৃৎ, সকলের প্রিয় মাওলা ভাই।

আলহাজ্ব গোলাম মাওলা ১৯৩৪ সালে ৫ নভেম্বর বরিশাল নগরীর আমানতগঞ্জ আহমেদ ভিলায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা মরহুম দলিল উদ্দিন আহমেদ, মাতা মরহুমা কামরুন নাহার। ভাই ও দুই বোন।তিনি ভাই-বোনদের মধ্যে সবার বড়। গোলাম মাওলা ১৯৫০ সালে বরিশাল এ.কে.স্কুল থেকে এস.এ.সসি পাশ ও ১৯৫৪ সালে বরিশাল সরকারি বিএম কলেজ থেকে গ্রাজুয়েশন ডিগ্রি (বি.কম) লাভ করেন। ছাত্র জীবন থেকেই সরকারি চাকরির প্রতি অনীহা এবং ব্যবসার প্রতি আগ্রহ থাকায় পড়াশোনা শেষ করে ব্যবসার কাজে মনোনিবেশ করেন। ১৯৬৯ সালে গণ আন্দোলনে গুলি বিদ্ধ ছাত্র জনতা কে তার অফিসে আশ্রয় দিয়ে সেবাযত্ন করেন তিনি। ১৯৭১ সালে মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে বরিশালে ছাত্র সমাজ ও বীর জনতা “স্বাধীন বাংলা সরকার” গঠনের যে বীরত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সূচনা করেছিল।

এ সচিবালয়ে থেকে দলমত নির্বিশেষে সকল বাঙালি মানুষের প্রতি সর্বাত্মক যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়া ও সহযোগিতা যে আহ্বান জানানো হয়। তাতে সাড়া দিতে প্রস্তুত ছিলেন উদীয়মান ব্যবসায়ী গোলাম মাওলা। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তখনও ভারতের পশ্চিমবঙ্গের চব্বিশ পরগনায় বসিরহাট মহাকুমার হাসনাবাদ নামক থানা সদরে ৯ নং সেক্টরের মূল ঘাঁটিতে অবস্থানরত পরিবার পরিজন মুক্ত বাংলাদেশে ফিরে আসেননি। এমনি অবস্থায় গোলাম মাওলা নিজের দু খানা কাঠ বডির লঞ্চ নিয়ে রওয়ানা হন পশ্চিমবঙ্গে। মাত্র তিন দিনের ব্যবধানে লঞ্চ দুটিতে অবস্থানরত মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সকল কে তিনি তাঁর লঞ্চে তুলে আনেন। ১৯৮৪ সালে ৪ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত বরিশাল পৌরসভা নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করেন। জনগণের ব্যাপক সমর্থনে বিপুল ভোটে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। তিনি নির্বাচিত হবার পর সকল প্রকার দল, মত, গোষ্ঠী ও ব্যক্তি স্বার্থের উর্ধ্বে থেকে কাজ করেছেন। সে পৌরসভা চেয়ারম্যান হওয়ার পর বরিশাল পৌরসভার ব্যাপক উন্নয়ন করেছেন।

পৌরভবন নির্মাণ, আন্তঃ জেলা বাস টার্মিনাল নির্মাণ, আধুনিক জবাই খানা স্থাপন, বি.আই.ডব্লিউ.টি-এ এর সদর দপ্তর ঢাকা থেকে বরিশাল স্থানান্তর, পোর্ট রোড, পলাশপুর ও আমানতগঞ্জ রোডকে সম্প্রসারণ এবং পলাশপুর ও আমানতগঞ্জ ব্রিজ নির্মাণ, সাগরদী দরগাবাড়ি ব্রিজ নির্মাণ সহ অসংখ্য নতুন নতুন ব্রিজ কালভার্ট নির্মাণ এবং ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন সহ অনেক উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করেন। আর এসব কাজ তিনি করেছেন সকল কমিশনার ও পৌরসভার কর্মকর্তা কর্মচারীদের সাথে নিয়ে। তাঁর আমলে সকল কমিশনার ও পৌর কর্মচারী নিবেদিত প্রাণ হয়ে কাজ করেছেন। তিনি সমগ্র বাংলাদেশের পৌর চেয়ারম্যানদের নিয়ে গঠন করেছিলেন “বাংলাদেশ পৌর চেয়ারম্যান সমিতি”। এই পৌর চেয়ারম্যান সমিতির প্রথম সম্মেলন হয়েছিল বরিশালে গোলাম মাওলার নেতৃত্বে ।

যেখানে সরকারের ৬/৭ জন মন্ত্রী উপস্থিত ছিলেন। তিনি ১৯৯০ সালের শেষের দিকে পৌর প্রশাসকের পদ থেকে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেন। বরিশাল পৌরসভা ১৮টি ওয়ার্ড নিয়ে তার পদক্ষেপের কারণে ১৮টি থেকে বরিশাল পৌরসভা ৩০টি ওয়ার্ড নিয়ে গড়ে ওঠে। তাঁর এই সুদূর প্রসারী চিন্তার কারণে পরবর্তী সময়ে সরকার বরিশাল পৌরসভা কে সিটি কর্পোরেশন ঘোষণায় কোন আইনী বাঁধার সম্মুখীন হয়নি বলে জানায় একটি সুত্র। বরিশাল বিভাগ ও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে অগ্রভাগে নেতৃত্ব ছিলেন গোলাম মাওলা। ক্রীড়া সংগঠক হিসেবে তাঁর রয়েছে পরিচিতি। ষাটের দশকে মাওলা বরিশাল মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। নাট্য ও সংস্কৃতিতে বিশেষ সহযোগিতা করতেন এবং ঢাউন হলে তিনি নিজেও অনেক ঐতিহাসিক নাটকে অভিনয় করেছেন।

গোলাম মাওলা ছিলেন ধর্মীয় বিশ্বাসে একজন পরিপূর্ণ মানুষ। তিনি তার বানারীপাড়ার নিজ বাড়িতে একটি কামিল মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন। এছাড়াও তৎকালিন সময়ে হযরত লেচুশাহ’র মাজার ও মাদ্রাসার কমিটির সভাপতি,জামে কসাই মসজিদ কমিটির সভাপতি,পাওয়ার হাউস জামে মসজিদ কমিটির সভাপতি ও পলাশপুর কাজীর গোরস্থান জামে মসজিদের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষা বিস্তারে তার অবদান ছিল তার। বরিশাল ইসলামিয়া কলেজ, দলিল উদ্দিন আহমেদ প্রাথমিক বিদ্যালয়, দলিল উদ্দিন আহমেদ বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয় এবং এ করিম আইডিয়াল কলেজ প্রতিষ্ঠায় তাঁর গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের তিনি অকাতরে অর্থ-সাহায্য দিতেন। তিনি নৌ পরিবহন শিল্পে আধুনিক বিলাস বহুল এবং যাত্রী সুবিধা সম্বলিত দক্ষিণ অঞ্চলের নৌ পরিবহন ব্যবসার পথিকৃৎ।

তিনিই প্রথম ঢাকা-বরিশাল রুটে যাত্রী সুবিধার কথা বিবেচনায় এনে বিলাস বহুল লঞ্চ নির্মাণ করেন। তিনি কির্তনখোলা নদীর বেলতলা খেয়াঘাট এলাকায় একটি বড় লঞ্চ তৈরির ডক ইয়ার্ড প্রতিষ্ঠা করেন। সুরভী ৬,৭,৮ ও ৯ লঞ্চ এই ডক ইয়ার্ডে তৈরি হয়েছে। তাঁর সাথে সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ সহ দেশের জাতীয় নেতৃবৃন্দের সাথে ছিল নিবিড় সম্পর্ক। এক কথায় বলা যায় তিনি ছিলেন একজন শিক্ষানুরাগী, শিল্প উদ্যোক্তা, দক্ষ প্রশাসক, সফল পিতা, বুদ্ধিমান, ধৈর্যশীল, বিবেকবান, ধর্মপ্রাণ অসাম্প্রদায়িক এবং মানবিক গুণাবলীতে পূর্ণ একজন আদর্শ মানুষ। ২০১৫ সালে ১৪ মে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর স্ত্রী জাহানারা বেগম। তাঁর তিন ছেলে ও মেয়ে রয়েছে। বড় ছেলে রিয়াজ উল কবির, মেজো ছেলে রিজভী উল কবির ও ছোট ছেলে রেজিন উল কবির। সেজো মেয়ে রুসেলী পারভীন কনা।পরিবারের পক্ষ থেকে গোলাম মাওলা’র বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করা হয়। সুত্র-লেখাঃ জাহিদুল ইসলাম মামুন।

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin