আশির দশকের রাজনীতিতে শেখ হাসিনাকে বাধাগ্রস্থ করা সেই মহলের কবলে দুই সিটি মেয়র

সিটি নিউজ ডেস্ক:: ১৯৮১ সালে চরম রাজনৈতিক ও আর্থসামাজিক অস্থিরতার মধ্যে ৩৩ বছর বয়সে ১৭ই মে বাংলাদেশে পা রাখেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনা। রাজনীতি শুরু থেকেই বাংলাদেশের কতিপয় গণমাধ্যম, সাংবাদিক সুশীল সমাজের একটি অংশ এবং সরকারী মালিকানাধীন সংবাদপত্র ও শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে নানান অপ-প্রচার ও ষড়যন্ত্র শুরু করে। শেখ হাসিনার স্বদেশে ফেরাকে বাধাগ্রস্থ করতে আগে থেকেই নানাবিধ অপপ্রচারে নামে গণমাধ্যমের একটি বড় অংশ। সরকারী মালিকানাধীন তৎকালীন সাপ্তাহিক বিচিত্রার সম্পাদক দেশ বরেণ্য কবি শামসুর রহমানের নাম ছাপা হলেও ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক হিসাবে কলকাঠি নাড়তেন শাহাদাত চৌধুরী। নয়া দিল্লিতে প্রেরণ করা মাহাফুজুল্লাহ’র তথ্য উপাত্ত্বের ভিত্তিতে আহম্মেদ নুরে আলম, শেহাব আহম্মেদ ও জবলুল আলম বিভিন্ন রিপোর্ট প্রকাশ করেন।

১৯৮১ সালের ১৩ মার্চ সংখ্যায় “বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের প্রবাসী নেতৃত্ব ভারতের রাজনৈতিক আশ্রয়ে আছি”। শিরোনামে সাপ্তাহিক বিচিত্রা প্রচ্ছদ প্রতিবেদন প্রকাশ করে। তার আগে ৪ মার্চ ভারতের আনন্দ বাজার পত্রিকার একটি সম্পাদকীয় থেকে বরাত দিয়ে প্রতিবেদনের শিরোনাম দেওয়া হয় ‘শেখ হাসিনাকে কেন্দ্র করেই ভারত এখন স্বপ্ন দেখে’, প্রতিবেদনে বলা হয় অকৃতজ্ঞ বাংলাদেশকে শিক্ষা দেওয়ার জন্যই বাংলাদেশের সঙ্গে কঠোর ব্যবহার করবে। কারণ এই বাংলাদেশী জাতি ভারতের অবদান ও বন্ধুত্ব ভুলে গেছে। ভারতের মস্কোপন্থী কমিউনিস্ট পার্টির দৈনিক প্যাট্টিয়েট পত্রিকার একটি প্রতিবেদনের উদ্বৃতি দিয়ে বলা হয় ‘কিন্তু স্ত্রীর নতুন পরিচয় তার জন্য সুখকর নয়’। যেমন করেই হোক তিনি এই রাজনীতির সঙ্গে জড়াতে চান না। ফিরেও আসতে চান না দেশে।

তার (ড. ওয়াজেদ মিয়ার) দুঃখ অন্যত্র। একসময়ে সবাই বলত বঙ্গবন্ধুর জামাই, আর এখন বলবে হাসিনার স্বামী। বিচিত্রায় লেখা প্রতিবেদনে আরও বলা হয় ভারত সরকারের আশ্রয়ে শেখ হাসিনা বাংলাদেশে অবস্থান করলেও আওয়ামী লীগের সভানেত্রী হওয়ার প্রেক্ষাপটে আরও তাকে ও তার দলকে সমর্থন করছে না। দিল্লির পর্যবেক্ষক মহল মনে করেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক উন্নয়ন হচ্ছে এবং মিসেস ইন্দিরা গান্ধী অভ্যন্তরীণ প্রতিকূল অবস্থার সম্মুখীন, তখন তিনি নতুন রাজনৈতিক ঝুঁকি নিতে রাজি নন।

আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব পাবার মতো সঠিক অবস্থানে নেই। শুধু তাই নয়, শেখ হাসিনা না কী ভারতে বসে বাংলাদেশ বিরোধী প্রচারণা করছেন। এমন প্রশ্ন পর্যন্ত উত্থ্যাপন করা হয় সাপ্তহিক বিচিত্রায়। আরও লেখা হয় শেষ পর্যন্ত আওয়ামী লীগের ভগ্নতরী ঝঞ্জাবিক্ষুব্ধ কাউন্সিল সমুদ্র জোড়াতালি দিয়ে পার হতে পেরেছে। অসম্বত্ব মিশ্রনের এই ঐক্য কতোদিন টিকবে সে সম্পর্কে আশাবাদ ব্যক্ত করা কঠিন। আওয়ামী লীগের ডাকে সাড়া দিতে দলের সমর্থক ও কর্মীরাই এখন বাধাগ্রস্থ।

শেখ হাসিনা যাতে রাজনীতিতে না আসেন এবং আওয়ামী লীগ যাতে খন্ড-বিখন্ড হয়ে নিঃশেষ হয়ে যায় সেই লক্ষে তৎকালীন জিয়াউর রহমানে সরকার কতিপয় সাংবাদিককে ব্যবহার করেছিলেন। সকল বাধা অতিক্রম করে আওয়ামী লীগের সরাসরি নেতৃত্ব গ্রহণ করেন শেখ হাসিনা ১৯৮১ সালের ২৯ মে সরকারী আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে প্রথম সমাবেশ করেন। দৈনিক ইত্তেফাকের রিপোর্টে বলা হয় ‘শেখ হাসিনার ওই সমাবেশে তিন লাখ লোকের সমাগম ঘটেছিলো’।

জনগণের মুক্তির লক্ষে বাকশাল কর্মসূচি বাস্তবায়নে আন্দোলনের লক্ষ্য। এছাড়াও প্রতিবেদনে শেখ হাসিনার ভাষণের বিস্তারিত তুলে ধরা হয়। নানবিধ ষড়যন্ত্র করে শেখ হাসিনাকে মাইনাস করতে চেয়েছিলো। সব বাঁধা পেরিয়ে বাংলাদেশ এখন শেখ হাসিনার নেতৃত্বে উন্নয়নশীল রাষ্ট্রে উন্নীত। স্বাধীনতার পরে দেশের কুচক্রি মহলগুলো আওয়ামী লীগকে ধংস করতে বঙ্গবন্ধুর পরিবার ও স্বজনদের টার্গেট করে নিশ্চিহ্ন করার চেষ্টা করেছিলো। যার ফলে ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট জাতির জনক ও তার পরিবার এবং স্বজনদের মধ্যে বর্তমান ঢাকা দক্ষিণ সিটি মেয়র শেখ ফজলে নুর তাপসের বাবা এবং বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহর দাদা শহীদ আব্দুর রব সেরনিয়াবাতসহ পরিবারের সদস্যদের ওপরে হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছিলো। ওই মহলটি এখনও বসে নেই। বঙ্গবন্ধুর পরবর্তী প্রজন্ম শেখ হাসিনা ও তাদের স্বজনদের টার্গেট করেই এখনও নানান ষড়যন্ত্র চলছে। আওয়ামী লীগকে নিঃশেষ করতে হলে বঙ্গবন্ধুর পরিবার ও তাদের স্বজনদেরকে আগে পরাস্থ করতে হবে। সেই লক্ষে চলছে ষড়যন্ত্র।

১৯৮১ সালে বাংলাদেশের রাজনীতিতে যারা শেখ হাসিনাকে প্রতিষ্ঠিত হতে বাধাগ্রস্থ করেছিলো এখন সেই সকল চক্রটি এখনও সক্রিয় হয়ে তথা কথিত সুশীল ও কতিপয় গণমাধ্যম এবং সাংবাদিককে ব্যবহার করে আসছেন। এই চক্রান্তের রোষানল থেকে বাদ যাচ্ছেন না ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নুর তাপস ও বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহ। ষড়যন্ত্রকারীদের সাথে তাল মিলিয়ে কাজ করছেন দলের অভ্যন্তরে থাকা ‘উড়ে এসে জুড়ে’ বসা ক্ষমতার সুবিধা ভোগী একটি অংশ। বঙ্গবন্ধুর ব্যাক্তিগত স্টাফ ছিলেন মোঃ হানিফ, সেই সুবাদে হয়েছিলেন ঢাকা নগর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও মেয়র। সেনা সমর্থিত সরকারের আমলে দল ত্যাগ করে ফেরদৌস আহাম্মেদ কোরাইশীর কিংস পার্টি খ্যাত প্রগ্রেসিভ ডেমোক্র্যটিক পার্টিতে ভিড়েছিলেন সাবেক মেয়র হানিফ পুত্র সাইদ খোকন, তখন কিছু সাংবাদিকের সাথে তার ওঠা বসা ও ঘনিষ্টতা ছিলো যারা শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে কথা বলতেন।

পৈত্রিক আধিপত্যের কারণে সাইদ খোকনকে ঢাকা সিটির মেয়র করলেও তা ধরে রখতে পারেননি তিনি। বর্তমানে পূর্বের আদলে মেয়র তাপসের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে অপপ্রচার চালিয়ে দলের ক্ষতি করছেন। বরিশালেও প্রায় একই অবস্থা স্বাধীনতা বিরোধীদের সাথে সমসুরে তাল মিলিয়ে বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহকে কোণঠাসা করতে আওয়ামী লীগের একটি অংশ নানবিধ ষড়যন্ত্র করে যাচ্ছে। যাদেরকে পরাজিত করতে পারলে আওয়ামী লীগকে পরাজিত করা যায়, সেই টার্গেট পূরণে মিশন বাস্তবায়নের নীলনকশার আভাস তৃণমূল ত্যাগী আওয়ামী লীগকে হতাশ করেছে।

সুত্র’ লেখক: সাংবাদিক মো. আসাদুজ্জামান-

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin