সাংবাদিক আনিসুর রহমান স্বপন‘র সংক্ষিপ্ত জীবনী

সিটি নিউজ ডেস্ক:: আপনাকে যদি প্রশ্ন করা হয় বরিশালে সাংবাদিকদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বই পড়েছেন এবং এখনো পড়েন তিনি কে? একবাক্যে উত্তর আসবে তিনি সাংবাদিক আনিসুর রহমান খান স্বপন। একজন প্রকৃত সাংবাদিককে সব বিষয়ে প্রচুর পড়ালেখা করতে হয়- যা প্রতিনিয়ত করে যাচ্ছেন ইংরেজি দৈনিক নিউ এজ এবং বাংলা ট্রিবিউন’র এই সিনিয়র রিপোর্টার।

অদম্য ইচ্ছে শক্তি আর দৃঢ় মনোবল থাকলে যেকোনো মানুষকে এগিয়ে নিয়ে যায় বহুদূর। তবে ইচ্ছে থাকলে যে এক চোখ দিয়েও সামাজিক, পারিবারিক বিভিন্ন কাজের পাশাপাশি টানা ছয় দশক ধরে নিয়মিত বই পড়া এবং লেখার কাজটি নিখুতভাবে করা যায় তার বড় উদাহরণ ৬৫ বছরে পা দেওয়া সাংবাদিক আনিসুর রহমান খান স্বপন।

স্বপনের ব্যক্তিগত সংগ্রহশালায় দেশি-বিদেশি লেখকদের বইয়ের সংখ্যা ২০ হাজারে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। যে বইগুলো স্বপন তার স্ত্রী ও একমাত্র কন্যা সন্তানের সহায়তায় নিয়মিত দেখভাল করে গুছিয়েও রেখেছেন। প্রয়োজনে গবেষক, শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীরা এসব বই পড়ার সুযোগও পাচ্ছেন বিনামূল্যে। এ বইয়ের ভাণ্ডার সংরক্ষণ করতে সম্পূর্ণ ব্যক্তি উদ্যোগে বরিশাল নগরের সদররোডস্থ নিজের পৈত্রিক ভিটে এবং কাউনিয়া প্রধান সড়কের শশুরালয়ে আলাদা দুটি সংগ্রহশালাও গড়ে তুলেছেন স্বপন। এ কাজে তার স্ত্রী অবসরপ্রাপ্ত বাংলা প্রভাষক বেগম ফয়জুন নাহার শেলী সবচেয়ে বেশি সহায়তা করছেন।

জানা গেছে, ১৯৫৭ সালের ৩০ জানুয়ারি ঢাকায় জন্ম নেন লেখক ও সাংবাদিক আনিসুর রহমান স্বপন। জন্ম ঢাকায় হলেও পড়াশোনা করেন বরিশালের ব্রজমোহন স্কুল ও ব্রজমোহন কলেজে। বাংলা সাহিত্যে স্নাতক এবং পরে স্নাতকোত্তর করেন তিনি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে কিছুদিন এম ফিল এবং ভারতের যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি গবেষণা করলেও তা অসমাপ্ত রেখে ১৯৮৬ সাল থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত থাকেন তেহরানে। সেখানে কাজ করেছেন রেডিও তেহরানের বাংলা অনুষ্ঠানে এবং ডেইলি তেহরান টাইমসে। আর তেহরান থেকে ফেরার সময় পরিবারের জন্য তেমন কিছু না আনলেও পড়ার জন্য ছয়শত কেজি ওজনের বইয়ের ঝুলি এনেছেন আলাদাভাবে।

পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, স্বপন মাত্র পাঁচ বছর বয়সে বরিশাল নগরের বগুড়া রোডের বাড়িতে গোসলখানায় খেলতে গিয়ে ডান চোখে তীব্র আঘাত পান। যে আঘাতে তার চোখটি দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলে। এরপর থেকে একচোখে দীর্ঘ ছয় দশক ধরে নিজের প্রতিটি কাজ করে চলছেন। বিশেষ করে বইপ্রেমী এ ব্যক্তি প্রতিনিয়িত নতুন নতুন বই পড়া আর নিয়মিত লেখার কাজটি করে যাচ্ছেন।
আনিসুর রহমান স্বপন বলেন, আমার মনে হয় অন্যান্য যে কোনো নেশার থেকে বই সংগ্রহ করা ও পড়া আর মারাত্মক এবং ব্যয়সংকুল নেশা। আর আমি মনে করি পাঠ অভ্যাস করাটা আমাদের সবার জন্য জরুরি। তবে অনেকেই ইউটিউব বা বিভিন্ন মাধ্যমে পড়ার চেষ্টা করি, তবে প্রিন্ট বই পড়ার মজাটা পাওয়া যাবে না। এখনো মুদ্রিত বইয়ের আকর্ষণ রয়েছে এবং উত্তরোত্তর বাড়ছে এবং বাড়বে।

তিনি বলেন, বাবা প্রয়াত আইনজীবী অ্যাডভোকেট ইসমাইল খানকে দেখে ছোটবেলা থেকেই বই পড়া তার খুব সখ ছিল। মাত্র চার থেকে পাঁচ বছর বয়সে ডান চোখে আঘাত পাই। এরপর বিভিন্নভাবে চিকিৎসা করালেও চোখটি ভালো হয়নি, শুরু হয়ে যায় একচোখের জীবন। তবে এমনও দিন গেছে চোখের ডাক্তার দেখানোর টাকা দিয়ে নতুন বই কিনে আনতাম। আবার সদররোডের বাসার নিচতলার দোকানের ভাড়া অনেক মাসেই আব্বা নিতে পারতেন না। কারণ বই কিনে কিনে ভাড়ার টাকা খুইয়ে দিতাম। তারপরও বই পড়া কখনো ছাড়িনি। মাত্র একটি চোখের ওপর চাপ দিয়ে বই পড়া চালিয়ে গেছি। এখনও এমন দিন যায় বই পড়তে পড়তে রাত-ভোর হয়ে যায়। আর বই পড়া থেকেই লেখার প্রতি আগ্রহটা সৃষ্টি হয়। তবে বয়স হওয়ায় মাঝে মধ্যে কিছুটা কষ্টও হয়।

ব্যক্তি জীবনে ষাটোর্ধ আনিসুর রহমান সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত থেকেও নিয়মিত বই পড়ার অভ্যাসের ফলে অর্জিত জ্ঞানকে পুঁজি করে লেখালেখির কাজটিও করছেন।

তিনি জানান, সংগ্রহে তার দুর্লভ কিছু বই রয়েছে। আর তার সংগ্রহশালায় বিভিন্ন ধরনের বইয়ের মধ্যে ইতিহাস ও দর্শনের বই বেশি রয়েছে।

সংক্ষিপ্ত জীবনী

প্রচার বিমুখ, অন্তর্মুখী, বইপোকা ব্যক্তি আ.ব.ম. আনিসুর রহমান খান স্বপন ১৯৫৭ সালের ৩০ জানুয়ারি ঢাকার ১৩ নম্বর নয়া পল্টনে নানা বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। তার পৈতৃক বাড়ি ঝালকাঠির নলছিটি উপজেলার ক্ষিরাকাঠি গ্রামে হলেও বেড়ে ওঠা বরিশাল শহরে। বাবা মো: ইসমাইল খান আইনজীবী ছিলেন এবং মা আয়েশা বেগম (হেলেন)। বরিশালের সিস্টার্স ডে প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে তার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা জীবনের শুরু। এরপর বরিশাল ব্রজমোহন বিদ্যালয় থেকে ১৯৭১ সালে (১৯৭২ সালে অনুষ্ঠিত) এসএসসি, বরিশাল ব্রজমোহন বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ থেকে ১৯৭৩ সালে এইচএসসি, একই প্রতিষ্ঠান থেকে ১৯৭৬ সালে বাংলা সাহিত্যে স্নাতক (সম্মান ) এবং ১৯৭৭ এ স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ড. কাজী দীন মুহম্মদের তত্ত্বাবধানে কথা সাহিত্যিক আবুল মনসুর আহমদের ভাষা চিন্তার উপর কিছুদিন এম ফিল এবং পশ্চিম বঙ্গের যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. পবিত্র সরকারের তত্ত্বাবধানে বরিশালের আঞ্চলিক ভাষার উপর পিএইচডি পর্যায়ে গবেষণা করলেও তা অসমাপ্ত রাখেন

১৯৮৬ সালে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের তেহরানে চলে যান এবং ১৯৯৬ পর্যন্ত সেখানে ছিলেন।তখন তিনি ইসলামিক প্রপাগেশন অর্গানাইজেশনে অনুবাদক, রেডিও তেহরানের বাংলা বিভাগে ঘোষক, সংবাদ পাঠক, সম্পাদক ও ভারপ্রাপ্ত পরিচালকের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি ‘ডেইলি তেহরান টাইমস’ পত্রিকায় কাজ করেন। এ ছাড়া পশ্চিমবঙ্গের পত্রিকা ‘প্রতিক্ষণ’, ‘বিভাব,’ ও ‘সাঙ্কৃতিক খবর’এ লেখালেখি করেছেন। ১৯৭০ সালে ঢাকা ডাইজেস্ট পত্রিকায় ‘সুইজারল্যান্ডের ঘড়ি শিল্প’ এবং ‘ হযরত মুসা ( আ:) এর সমুদ্র অতিক্রম ও ফেরাউনের শলিল সমাধি শিরোনামে দু’ টি অনুবাদ কর্মের মাধ্যমে তার লেখক জীবনের আত্মপ্রকাশ ঘটে। তৎকালীন’ পাকিস্তানি খবর’ পত্রিকার লেখক ও বামপন্থী ( মার্ক্সবাদী) চিন্তা ধারায় বিশ্বাসী ( পরবর্তীতে পীরের খলিফা) ছোটচাচা বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তা মোঃ হাবিবুর রহমান খানের উৎসাহ ও অনুপ্রেরণায় ছোটবেলা থেকেই আনিসুর রহমান খান স্বপনের লেখালেখি ও পাঠের অভ্যাস গড়ে ওঠে এবং তখন থেকেই বই সংগ্রহ করা তার প্রিয় শখে পরিণত হয়। বর্তমানে তার বিশাল গ্রন্থাগারটিতে বহু দুর্লভ বই রয়েছে। ১৯৭৩ সালে বরিশাল থেকে প্রকাশিত ‘সাপ্তাহিক গণডাক’ পত্রিকার মাধ্যমে তার সাংবাদিক জীবনের শুরু। এরপর ১৯৮২-১৯৮৪ পর্যন্ত জাতীয় দৈনিক আজাদ, প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে বিদেশে পাড়ি জমানোর আগ পর্যন্ত স্থানীয় সাপ্তাহিক লোকবাণী, দেশে ফিরে এসে জাতীয় দৈনিক ভোরের কাগজ ও বাংলা ট্রিবিউন এ কাজ করেন। বর্তমানে তিনি ইংরেজি দৈনিক নিউ এজ এবং ঢাকা ট্রিবিউন এর সাথে বরিশাল প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করছেন। তিনি বরিশাল রিপোর্টার্স ইউনিটির প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক ছিলেন। আনিসুর হমান খান স্বপন বাংলা একাডেমি, বরিশাল পাবলিক লাইব্রেরি ও এফপিএবি বরিশাল এর আজীবন সদস্য।

প্রকাশিত গ্রন্থ ফার্সী ভাষার ব্যাকরণ (১৯৯০), পারস্যে রবীন্দ্র চর্চা (১৯৯৩), বাংলাদেশে ফার্সী ভাষা ও সাহিত্য (১৯৯৫), পারস্যে রবীন্দ্রনাথ (২০১৭), একটি মোরগের কাহিনী ( অনুবাদ,১৯৮৬), পারলৌকিক জীবন ( অনুবাদ: ১৯৮৭) এবং তাহেরেহ সফরজাদেহ: স্বনির্বাচিত কবিতা (অনুবাদ: ১৯৯১)

প্রকাশিতব্য গ্রন্থ মাহাদী সহেলির কবিতা (অনুবাদ), দারাশুকোর অনূদিত উপনিষদ, নাজিম হেকমতের কবিতা (অনুবাদ), কাহলিল জীব্রানের সুভাষিত সুবচন  ( অনুবাদ), জরথ্রুস্টের আবেস্তা এবং মওলানা রুমির নেই ও শ্রী কৃষ্ণের বাঁশি। পারস্যে রবীন্দ্রনাথ বইটির জন্য কলিকাতার ‘সাঙ্কৃতিক খবর’ গোষ্ঠী তাকে ভূমেন্দ্র গুহ স্মৃতি পুরস্কারে সম্মানিত করে।

সুত্র, মুক্তবুলি

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin