খুনের মামলার চার্জশীটভূক্ত আসামী ইউপি চেয়ারম্যান টুকু নিলেন শপথ !

রাহাদ সুমন,বিশেষ প্রতিনিধিঃ বরিশালের বানারীপাড়ায় উপজেলা জাসদের সাংগঠনিক সম্পাদক সৈয়দ হুমায়ুন কবির হত্যা মামলার চার্জশিটভুক্ত আসামি সৈয়দ মজিবুল ইসলাম টুকু চাখার ইউনিয়নে নৌকার মনোনয়ন নিয়ে নির্বাচিত হয়ে শপথ নিয়েছেন।

জনপ্রতিনিধির বিরুদ্ধে ফৌজদারী মামলায় আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হলে তাকে সাময়িক বরখাস্তের বিধান থাকলেও সেখানে তিনি আবার কিভাবে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হলেন এবং দায়িত্ব পালণ করবেন এ নিয়ে সচেতন মহলে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

এসব অমিমাংসিত প্রশ্নের মধ্যেই ১৩ জুলাই মঙ্গলবার দুপুরে চাখারের দ্বিতীয়বারের মত নির্বাচিত চেয়ারম্যান হিসেবে তিনি শপথ নেন। বরিশাল সার্কিট হাউজের সম্মেলন কক্ষে প্রথম দফায় নবনির্বাচিত ৪৯ জন চেয়ারম্যানকে শপথবাক্য পাঠ করান জেলা প্রশাসক জসীম উদ্দীন হায়দার।

আরেকজন চেয়ারম্যান সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে ঢাকার পঙ্গু হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকায় তিনি এই শপথে অংশ নিতে পারেননি। শপথ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে জেলা প্রশাসক ইউপি চেয়ারম্যানদের সরকারি বিধিবিধান মেনে জনকল্যাণে কাজ করার নির্দেশনা দেন।

কেউ শপথ ভঙ্গ করলে তার বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়ার বিষয়টিও স্মরণ করিয়ে দেন তিনি। এ সময় স্থানীয় সরকার বিভাগের উপ-পরিচালক শহীদুল ইসলাম, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) প্রশান্ত কুমার দাস, নেজারত ডেপুটি কালেক্টর (এনডিসি) মো. নাজমূল হুদা এবং সহকারী কমিশনার সুব্রত বিশ্বাস দাসসহ অন্যান্যরা উপস্থিত ছিলেন।

এদিকে ২০০৯ সালের স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) আইনে কোন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বা সদস্যের বিরুদ্ধে ৩৪’র উপ-ধারা (৪) এ বর্ণিত অপরাধে অপসারণের জন্য কার্যক্রম আরম্ভ করা হইয়াছে অথবা তাঁহার বিরুদ্ধে ফৌজদারী মামলায় অভিযোগপত্র আদালত কর্তৃক গৃহীত হইয়াছে অথবা অপরাধ আদালত কর্তৃক আমলে নেওয়া হইয়াছে, সেক্ষেত্রে সরকার লিখিত আদেশের মাধ্যমে চেয়ারম্যান অথবা সদস্যকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করিতে পারিবে।

উপ-ধারা (১) এর অধীনে সাময়িকভাবে বরখাস্তের আদেশ প্রদান করা হইলে আদেশ প্রাপ্তির ৩ (তিন) দিনের মধ্যে সংশ্লিষ্ট চেয়ারম্যান ধারা ৩৩ এর বিধানমতে নির্বাচিত প্যানেল চেয়ারম্যানের নিকট দায়িত্ব হস্তান্তর করিবেন এবং উক্ত প্যানেল চেয়ারম্যান সাময়িক বরখাস্তকৃত চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে আনীত কার্যক্রম শেষ না হওয়া পর্যন্ত অথবা চেয়ারম্যান অপসারিত হইলে তাঁহার স্থলে নতুন চেয়ারম্যান নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করিবেন।

জনপ্রতিনিধির বিরুদ্ধে ফৌজদারী মামলায় আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হলে তাকে সাময়িক বরখাস্তের এ বিধান থাকলেও ২০১৩ সালে চাখারের তৎকালীণ ইউপি চেয়ারম্যান সৈয়দ মজিবুল ইসলাম টুকুর বিরুদ্ধে হত্যা মামলায় আদালতে চার্জশীট দাখিলের পরে ওই সময় তিনি বহাল তবিয়তে প্রায় তিন বছর (২০১৩-২০১৬) চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালণ করে তার মেয়াদ শেষ করেন। অজ্ঞাতকারনে তার বিরুদ্ধে তখন ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

এসব অমিমাংসিত প্রশ্নের মধ্যেই ১৩ জুলাই মঙ্গলবার চাখারের দ্বিতীয়বারের মত নির্বাচিত চেয়ারম্যান হিসেবে তিনি শপথ নিলেন। তাহলে আগামী ৫ বছর চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালণকালীন স্থানীয় সরকার আইনের ওই ধারামতে তার বিরুদ্ধে কি ব্যবস্থা নেওয়া হবে ? নাকি বহাল তবিয়তে তিনি এবারও তার মেয়াদ পূর্ণ করবেন এ নিয়ে জনমনে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

এ প্রসঙ্গে বানারীপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রিপন কুমার সাহা বলেন, তার বিরুদ্ধে চার্জশীটের কপিসহ কেউ লিখিত অভিযোগ করলে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

প্রসঙ্গত হত্যা মামলার চার্জশীটভূক্ত আসামী ও সাবেক ছাত্রদল নেতা সৈয়দ মজিবুল ইসলাম টুকুকে নৌকার টিকিট দেওয়ায় শুরু থেকেই স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও জাসদে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। ওই সময় টুকুসহ ওই হত্যা মামলার সকল আসামিদের ফাঁসির দাবিতে হত্যা মামলার বাদী ও নিহত সৈয়দ হুমায়ুন কবিরের ভাই সৈয়দ আপনুর এবং তার অশীতিপর বৃদ্ধা মা ও ভাই-বোনসহ জাসদ নেতা-কর্মীরা বানারীপাড়া পৌর শহরে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার এবং বরিশালে টাউন হলের সামনে মানববন্ধন করেছিলেন।

তখন বানারীপাড়া ও বরিশালসহ বিভিন্ন এলাকায় আসামীদের ছবির গলায় ফাঁসির দড়ি দেওয়া পোষ্টার সাঁটানো হয়। এছাড়া ঢাকায় জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনেও মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়।

প্রসঙ্গত, ২০১৩ সালের ১৯ জুলাই শুক্রবার জুমার নামাজ পড়তে যাওয়ার পথে উপজেলা জাসদের তৎকালীন সাংগঠনিক সম্পাদক রোজাদার সৈয়দ হুমায়ুন কবিরকে শরীরের বিভিন্ন স্থানে লোহার পেরেক ঢুকিয়ে ও অন্ডকোষ থেতলে দেওয়াসহ মধ্যযুগীয় কায়দায় বর্বর নির্যাতন চালিয়ে হত্যা করা হয়।

জানা গেছে মামলাটি বর্তমানে বিচারাধীন রয়েছে এবং আসামীরাও জামিনে রয়েছেন। সেই মামলার চার্জশীটভুক্ত প্রধান আসামি চাখার ইউপির সাবেক চেয়ারম্যান ও বিএনপি থেকে এসে উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক পদ পাওয়া সৈয়দ মজিবুল ইসলাম টুকুকে লাল-সবুজ পতাকা, স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব, শান্তি, উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রার প্রতীক নৌকার মনোনয়ন দেওয়ায় স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও ১৪ দলের শরীক জাসদের নেতা ও কর্মীদের মাঝে চরম ক্ষোভ রয়েছে।

উল্লেখ্য, ২০১৬ সালে অনুষ্ঠিত ইউপি নির্বাচনে সৈয়দ মজিবুল ইসলাম টুকু আওয়ামী লীগ মনোনীত চেয়ারম্যান প্রার্থী খিজির সরদারের নৌকার বিরোধীতা করে বিদ্রোহী প্রার্থী হওয়ায় তখন দল থেকে তাকে সাময়িক বহিষ্কার করা হয়েছিল। সৈয়দ মজিবুল ইসলাম টুকু ২০০১ সালে চাখার ইউনিয়ন ছাত্রদল সভাপতি হুমায়ুন কবির সিকদার হত্যা মামলারও আসামি ছিলেন।

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin