বৃষ্টি কামনায় ব্যাঙের বিয়ে

চার কোণে চারটি কলাগাছ, মাঝে একটি ঘট। আরতাতে সিঁদুর দেওয়া। চারিদিকে সাজানো আলপনায়। বরণ ডালা সাজানো হয়েছে প্রদীপ, ফুল, আর ধান দুর্বার পসরা দিয়ে। পুরোহিতের মন্ত্রপাঠ, উলুধ্বনি, সিঁদুর দান, সবশেষে সাতপাকের আয়োজন। ছিল উপহার সামগ্রী প্রদান, আশীর্বাদ প্রদান এমনকি অতিথি আপ্যায়নের ব্যবস্থাও। তবে বর-কনে হিসেবে কোনো নারী-পুরুষ নয়, সজ্জিত করা হয় দুটো ব্যাঙকে। সব আচার মেনে বিয়েও দেওয়া হয় তাদের।

রোববার রাতে দিনাজপুর সদর উপজেলার রাজবাটী এলাকার হিরবাগান রক্ষা কালী মন্দির প্রাঙ্গণে এই বিয়ের আয়োজন করেছিলেন এলাকাবাসী। ভরা বর্ষাতে বৃষ্টি না হওয়ায় প্রচলিত লোক সংস্কৃতির এমন ব্যতিক্রমী আয়োজন করেন তারা।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ব্যতিক্রমী এ বিয়ের পণ হিসেবে ধার্য করা হয় ১০১ টাকা। এসেছিল বরযাত্রীও। রাজবাটী এলাকায় বিকেল থেকেই শুরু হয় এই আয়োজন। বিয়ের আসরটি ছিল নাচ, গান আর হৈ চৈ’য়ে মুখরিত।

রোববার রাতে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, বিয়ের কাজে ব্যস্ত অনেকেই। পুরোহিত মন্ত্র পড়ছে আর সেই তালেই বর-কনে ব্যাঙকে নিয়ে সাত পাক ঘুরছিলেন সাত থেকে আটজন। সিঁদুর দান শেষে ছেড়ে দেওয়া হলো বর-কনেবেশি ব্যাঙ দুটিকে। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের শাস্ত্রবিধি মেনে সব আয়োজন করা হয়।

লোক সংস্কৃতিতে প্রচলিত আছে, ‘বর্ষার সময় বৃষ্টি না হলে ব্যাঙের বিয়ে দিলে বৃষ্টি হয়’। তাইতো গত কয়েক বছর ধরেই হয়ে দিনাজপুরের এই অঞ্চলে চলছে এমন আয়োজন। স্থানীয়রা জানায়, শুধু বিশ্বাসই নয়, যে বছর বৃষ্টিপাত হয় না সে বছরে এমন আয়োজন করলে দেখা মেলে বৃষ্টির। তাদের ভাষায়, বিশ্বাসে মেলায় বস্তু, তর্কে বহুদুর। আর এমন বিশ্বাস থেকেই লোকচারের আয়োজনগুলো চলে আসছে যুগ যুগ ধরে।

সনাতন ধর্মাবলম্বীদের শাস্ত্রবিধি মেনে মানুষের মতই সব আয়োজন ছিল এই বিয়েতে। এই বিয়েতে ব্যাঙ বরের মায়ের দায়িত্ব পালন করেন সুলেখা মহন্ত আর কনের মায়ের দায়িত্ব পালন করেন চন্দনা। তবে করোনার কারণে এবারে আয়োজন সংক্ষিপ্ত হয়েছে বলে জানিয়েছেন আয়োজকরা। বিয়ে শেষে সবারই প্রার্থনা ছিল বৃষ্টির পাশাপাশি করোনা মহামারি থেকে সকলকে মুক্ত রাখার।

ব্যাঙের বিয়ের আয়োজকদের মধ্যে চন্দনা সরকার বলেন, গত কয়েকদিন ধরেই অসহ্য গরম। দেখা নেই বৃষ্টির। তাই আমরা এই উদ্যোগ নিয়েছি। ব্যাঙের বিয়ে দিলে বৃষ্টি হবে। এই আয়োজনের মাধ্যমে বৃষ্টির পাশাপাশি করোনা মহামারি থেকে ঈশ্বর যেন আমাদের সকলকে করোনা থেকে রক্ষা করেন এই প্রার্থনা করি।

বাসন্তী সরকার বলেন, গত কয়েকদিন ধরেই বৃষ্টি নাই। এখন আমন মৌসুম রোপনের সময়। কিন্তু বৃষ্টির অভাবে ধানের চারা রোপন করা যাচ্ছে না। ঈশ্বর যাতে করে বৃষ্টি দেন, আজকেই যাতে বৃষ্টি হয় এই কামনা আমাদের। এ কারণেই ব্যাঙের বিয়ের আয়োজন করা হয়েছে।

দর্শনার্থী সুমনা অধিকারী বলেন, আমি ব্যাঙের বিয়ের কথা শুনেছি, কিন্তু কখনও দেখিনি। আমি পার্শ্ববর্তী এলাকা থেকে এসেছি। এখানকার সকলে মিলে উদ্যোগ নিয়ে অনুষ্ঠানটি করেছেন।

আরেক দর্শনার্থী ঝুমুর সরকার বলেন, আমি বাবা-দাদাদের মুখে শুনেছি ব্যাঙের বিয়ের কথা, কিন্তু আজকে আয়োজনটি দেখলাম। খুব ভালো লাগছে এমন আয়োজন দেখে।

এই বিয়ের আয়োজনে পুরোহিতের দায়িত্ব পালন করেন তপন কুমার গোস্বামী। তিনি বলেন, বেশ কয়েকদিন যাবৎ বৃষ্টি না হওয়ার কারণে এমন আয়োজন। এটা আমাদের লোকাচার। আমরা ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করি যাতে করে বৃষ্টি হয় এবং করোনার এই গ্রাস থেকে সকলে মুক্ত হই।

বিয়ের আয়োজনে উপস্থিত ছিলেন লোকসংস্কৃতি নিয়ে গবেষণায় নিয়োজিত দিনাজপুর সরকারি কলেজের দর্শন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক গবেষক ড. মাসুদুল হক। তিনি বলেন, উত্তরবঙ্গের লোকসংস্কৃতির কাজ করতে গিয়ে পুথিপুস্তকে এমন আয়োজনের বিষয়টি আমরা জেনেছি। উত্তরবঙ্গে বিশেষ করে সনাতন ধর্মাবলম্বী ও আদিবাসী সমাজ আবহাওয়া প্রতিবেশের সাথে সম্পৃক্ত থেকে দীর্ঘদিন ধরে ব্যাঙের এমন বিয়ের আয়োজন করে থাকেন।

তিনি আরও বলেন, আজ সারাদিন খরা ছিল। যখন ব্যাঙের বিয়ে শুরু হয় তখন দুই-এক ফোঁটা বৃষ্টির ঝিরিঝিরি জল পড়তে দেখলাম। এটা যেন লোকবিশ্বাসেরই প্রতিচ্ছবি।এই চর্চা আরও বেশি থাকবে এটাই চাই । পাশাপাশি আরও লোক ঐতিহ্যের ভিতর দিয়ে বাঙ্গালি চেতনা সবসময় জাগ্রত থাকবে এটাই আশা করি।

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin