নাগরিক দুর্ভোগ: আটকে আছে ২৬শ কোটি টাকার প্রকল্প

খাল উদ্ধার না হলে ডুববে বরিশাল

২৩ খালের ১৫টির অস্তিত্ব নেই * ৪টিতে জোয়ার-ভাটা থাকলেও মৃতপ্রায় বাকি চারটি

মাস্টার ড্রেন হিসাবে ব্যবহৃত খালগুলো দখল হয়ে যাওয়ায় জলাবদ্ধতার হুমকিতে বরিশাল নগরী। বিষয়টি নিয়ে চিন্তিত নগর পরিষদও। নগরের ২৩টি খালের অধিকাংশেরই এখন আর কোনো অস্তিত্ব নেই। হাতেগোনা ৭-৮টি যা আছে তাও মৃতপ্রায়। বর্ষার পানিতে হাবুডুবু খাওয়ার হাত থেকে বাঁচতে এরইমধ্যে খাল উদ্ধারের পদক্ষেপ নিয়েছে নগর ভবন।

তবে সেই কাজ শেষ পর্যন্ত কতটুকু হবে তাই নিয়ে রয়েছে সংশয়। এমনিতেই অর্থাভাবে আটকে আছে নগরীর সিংহভাগ উন্নয়ন কর্মকাণ্ড। তার ওপর খাল উদ্ধার ও এর দুপাশে সড়ক নির্মাণের জন্য ঢাকায় পাঠানো ২ হাজার ৬শ কোটি টাকার প্রকল্পেরও অনুমোদন মিলছে না। ওই টাকা পাওয়া না গেলে সাময়িকভাবে খাল উদ্ধার হলেও তা স্থায়ীভাবে ধরে রাখার কোনো উপায় থাকবে না। ফলে আবারও তা চলে যাবে খালখেকোদের দখলে।

ভাটি অঞ্চলের এলাকা বরিশাল শহরের মানুষের সঙ্গে জলাবদ্ধতা শব্দটির তেমন পরিচয় ছিল না। এখানে কখনো পানি জমত না। শহরের বুক চিরে বইতো ২৩টি জোয়ার-ভাটার খাল। জালের মতো ছড়িয়ে থাকা এসব খাল দিয়ে মানুষ ও পণ্য পরিবহণের দৃশ্য দেখেই এক সময় বরিশালকে তুলনা করা হয়েছিল প্রাচ্যের ভেনিসের সঙ্গে। বৃষ্টির পানি খুব সহজেই ড্রেন হয়ে গিয়ে পড়ত খালে।

পরে তা কীর্তনখোলায় মিশে ভাটিয়ালির সুর তুলত। সময়ের সঙ্গে হারিয়ে গেছে সেই আবহ। বিভিন্ন সময়ে নগর পিতার দায়িত্বে থাকা রাজনৈতিক নেতাদের ভুল সিদ্ধান্তে হারিয়ে গেছে অধিকাংশ খাল। ১৫টির এখন আর কোনো অস্তিত্বই নেই। বাকি ৮টির মধ্যে ৪টিতে জোয়ার-ভাটা থাকলেও বাকি ৪টি মৃতপ্রায়। কোনোভাবে বেঁচে থাকা খালগুলোর দুপার দখল হয়ে গেছে বহু আগেই। বর্তমানে চলছে খালের ভেতরে ময়লা ফেলা। ফলে এগুলোও ক্রমশ পানি চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে। নগরীর বটতলা এলাকায় জোয়ার-ভাটার খালটি ভরাট করে সরু ড্রেনের রূপ দেওয়া হয়েছে। এর ওপর বহুতল ভবন বানিয়ে দেওয়া হয় লিজ। একই পদ্ধতিতে হত্যা করা সদর রোড সংলগ্ন জিলা স্কুল খাল, ভাটার খাল, ভাটিখানা খালসহ অন্তত আরও ১০টি খাল।

বরিশালের পরিবেশ ফেলো মুরাদ আহম্মেদ বলেন, ‘এখন সামান্য বৃষ্টিতেই পানি জমে যায় নগরীর বিভিন্ন এলাকায়। একটু খেয়াল করলে দেখা যাবে সেসব স্থানে পানি জমছে সেখানে আগে ছিল স্রোতস্বিনী খাল। নগরের সদর রোড, বগুড়া রোড, বটতলাসহ প্রায় সব জায়গাতেই এক সময় খালের মাধ্যমে পানি নেমে যেত নদীতে। খাল না থাকায় সেই পানিই এখন জমছে সড়কে।

পরিবেশবিদ আর নাগরিক সমাজের নেতাদের এ বক্তব্যের প্রতিফলনই নগর ভবনের দায়িত্বশীলদের কণ্ঠে। বরিশাল সিটি করপোরেশনের (বিসিসি) কনজারভেন্সি বিভাগের দায়িত্বে থাকা ডা. রবিউল ইসলাম বলেন, ‘এটা ঠিক যে অর্থাভাবে বর্ধিত এলাকা যথাক্রমে ২৬, ২৭, ২৮, ২৯ এবং ৩০নং ওয়ার্ডে এখন পর্যন্ত ড্রেনেজ সিস্টেম বলে কিছুই করতে পারিনি আমরা। তবু নদী তীরবর্তী আর কিছু খাল অবশিষ্ট থাকায় এসব জায়গায় বৃষ্টির পানি খুব একটা জমে থাকে না। নিয়মিত ড্রেন পরিষ্কার করার কারণে নগরেও জলাবদ্ধতা নেই বললেই চলে। তবে খাল কিংবা মাস্টার ড্রেন না থাকায় সামনের দিনগুলো নিয়ে উদ্বেগে আছি আমরা।’

বিসিসির নির্বাহী প্রকৌশলী আবুল বাশার বলেন, ‘খালগুলোর ওপর নির্ভরতা থাকায় ড্রেনেজ ব্যবস্থা সংশ্লিষ্ট যখনই কোনো পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে তখনই মাস্টার ড্রেন হিসাবে বিবেচনায় রাখা হয়েছে খালগুলো। এখন সেসব খাল না থাকায় বিপাকে পড়েছি আমরা। ড্রেনগুলোর নেটওয়ার্কিং নিয়েও দেখা দিয়েছে জটিলতা। এখানে থাকা ১৫০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে ড্রেনেজ ব্যবস্থার অনেক জায়গায় ইন্টার কানেক্টর-আউটফল নেই। বর্তমানে অবশিষ্ট থাকা খালগুলো উদ্ধারের কাজ শুরু হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে বরিশাল সিটি করপোরেশনের মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহ বলেন, ‘বর্তমানে জেল খাল এবং সাগরদী খাল উদ্ধারের কাজ চলছে। দখলকৃত অংশ উদ্ধারের পর সীমানা পিলার বসিয়ে দিচ্ছি আমরা। পর্যায়ক্রমে অন্যান্য খালগুলোও উদ্ধার করা হবে। এসব খালের দুপাশ বাঁধাই করে সড়ক নির্মাণ করে দিলে আর দখল হওয়ার আশঙ্কা থাকবে না।’ মন্ত্রণালয়ে জমা প্রকল্প প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘জাতির পিতার কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বরিশালকে ভালোবাসেন। তার প্রমাণ এ বরিশালের উন্নয়নে একের পর এক প্রকল্প গ্রহণ। এটিও তার নলেজে আছে। আমার বিশ্বাস খুব শিগগিরই তিনি প্রকল্পটির অনুমোদন দেবেন এবং কাজটি সম্পন্ন করে বরিশালকে স্থায়ী জলাবদ্ধমুক্ত নগরী হিসাবে উপহার দিতে পারব ইনশাআল্লাহ।’
সূত্র: যুগান্তর


Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin