প্রতিবন্ধি তামান্নার তুলিতে বঙ্গবন্ধু ও প্রধানমন্ত্রীর ছবি: চায় একটু সহযোগীতা

সুমাইয়া জিসান :: জন্মটাই যেন অভিশাপ। জন্মের পর থেকেই না খেয়ে অনাহারে অধ্যাহারে দিন কাঁটাতে হয় প্রতিবন্ধী তামান্ন জাহানকে। সহ্য করতে হয় লাঞ্ছনা গঞ্জনা শুনতে হয় মানুষের কটুক্তি। এ জীবন যেন থাকার চেয়ে না থাকাই ভালো। ক্ষুধার যন্ত্রণার জন্য হাত পাততে হয় দারে দারে। নিয়তি যেন বড়ই নিষ্ঠুর। খাবারের জন্য হাত পেতেও জোটে না এক মুঠো অন্ন। অসুস্থ প্রতিবন্ধী তামান্না অর্থের অভাবে চিকিৎসা পর্যন্ত করাতে পারে না। বরিশালের উজিরপুর উপজেলার গুটিয়া স্টিল ব্রীজ সংলগ্ন পুলিশ ক্যাম্পের পাশে ছোট একটি কুঁড়ের ঘরে থাকেন তামান্নাসহ তার মা-বাবা। পিতা ওবায়দুল কবির ও মাতা আফরোজা বেগম। আর পাঁচটা সুস্থ শিশুর মতই জন্মগ্রহণ করেছিলেন তামান্না। জন্মের আড়াই বছর হওয়ার পরে বাত জ্বর হয় তামান্নার। ওই সময়ে অর্থের অভাবে সঠিক চিকিৎসা না হওয়ার কারনে বাক ও শ্রবণ শক্তি হারাতে হয় তামান্নাকে।

সেই থেকে তামান্না প্রতিবন্ধীর কাতারে নাম লিখিয়েছেন। মা আফরোজা বেগম বলেন, তিন বছর বয়স থেকে তিনি লক্ষ করেন তামান্নার হাতে যা কিছু দেয়া হয় তা দিয়ে সে দাগ দেয় আবার সেটাকে ভালো করে দেখে। আবার মুছতে চেষ্টা করে। এভাবে বেশ কিছুদিন চলতে থাকে। হঠাৎ করে একদিন মা আমেনা দেখেন তামান্না বাহিরে বৃষ্টি দেখে কি যেন ছবির মত এঁকেছে। দেখে সকলে অবাক হন এবং প্রশংসাও করেন। সেই থেকে এখন পর্যন্ত ছবি আঁকছেন। তামান্না বলতে পারে না কথা, কানেও শুনতে পাননা। তারপরও নিজ চেষ্টায় সে সংকরপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত লেখাপড়া করেছেন। প্রতিবন্ধী হওয়ার অভিশাপে লেখাপড়া থেকে তার ইতি টানতে হয়েছে। ৎ

অসুস্থতার কারনে আর পরতে পারেনি তিনি। তারপরও থেমে থাকেনি শিশুকাল থেকে বিভিন্ন দার্শনিক ব্যক্তি, বঙ্গবন্ধু ও প্রধানমন্ত্রীসহ অশংক্ষ গুনিজন, লেখক, রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গের ছবি, প্রাকৃতিক দৃশ্যের ছবিসহ অনেক গুনি ব্যক্তিদের তার রং তুলির আঁচড়ে ছবি এঁকে তুলে ধরেন সকলের কাছে। এ পর্যন্ত তিনি একশরও বেশি ছবি একেছেন। পুরোপুরি স্বীকৃতি না পেলেও কিছু ছবি আঁকাপ্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে পেয়েছেন সান্তনা স্বরূপ পুরস্কার । নিজ হাতে আঁকা ছবি নিয়ে শিশু একাডেমী, শিল্পকলা একাডেমী, সমাজসেবা অধিদপ্তরের কার্যালয়সহ ঘুরেছেন অনেক দুয়ারে স্বীকৃতি পাওয়ার জন্য। কিন্তু বিধি যেন বাম। কেউ এক বারের জন্যও ফিরে তাকাননি তামান্নার দিকে। শুধু ছবি আঁকা নয়, তিনি একাধিক প্রতিবার অধিকার।

নিজ হাতে পোশাকের ডিজাইন করে শেলাই পর্যন্ত করেন। পারেন কাঁথা শেলাই করতেও, ঘরও গোছাতে পারেন তিনি। আবার মাকে ব্যবসায়িক কাজেও সহযোগিতা করেন। এ থেকে যা আয় হয় তা দিয়ে কোন রকম সংসার চলে তাদের। অনেক সময় না খেয়েও থাকতে হয়। গতকাল শহীদ আবদুর রব সেরনিয়াবাত বরিশাল প্রেসক্লাবে এসে অঝোর কাঁদতে কাঁদতে আফরোজা বেগমের প্রতিবন্ধী মেয়েকে নিয়ে তার জীবন কাহিনীর বর্ণনা দেন। প্রতিদিন লড়াই করে বাঁচতে হয় অসুস্থ স্বামী ও প্রতিবন্ধী কন্যাকে নিয়ে। এমন পরিস্থিতিতে কি করবো আমি? রূপালী ব্যাংক থেকে কিছু টাকা লোন নিয়ে সবজির ব্যবসা শুরু করি । অসুস্থ স্বামী বিছানা থেকে উঠতে পারছেন না। আমি কাক ডাকা ভোরে বরিশাল পাইকারী সবজির বাজার থেকে সবজি এনে গুটিয়ার বাজারে বসে বিক্রি করি। বিক্রির টাকা জমিয়ে মাসিক কিস্তি পরিশোধ করতে হয়।

করোনার এই সময়ে না পারছি কিস্তির টাকা পরিশোধ করতে। না পেরেছি স্বামী-সন্তানকে নিয়ে দুবেলা খেতে। নিজেও অসুস্থ রোজ দোকান খুলে বসতে পারিনা। তাই অনেক সময় না খেয়ে থাকতে হয় আমাদের। আজ দুইদিন ধরে ঘরে খাবার নেই। বের হয়েছি কেউ কিছু দেয় কি না সে জন্য। সকালে ডিসি অফিসে গিয়ে ছিলাম সেখান থেকে সাংবাদিক কাজী মিরাজ স্যারের কাছে পাঠিয়েছেন। তাই মেয়েকে নিয়ে এসেছি। আমার অনেক দুঃখ, আমি ও আমার স্বামী মোরে গেলে তামান্নার কি হবে। ওকে দেখার মতো কেউ নেই এই পৃথিবীতে। এখন আমার মেয়ে পুরোপুরি সাবালিকা তাই ওকে নিয়ে সবসময়ে চিন্তায় থাকতে হয়।

আমার দিকেও অনেকে কুদৃষ্টি দেয় এবং আমি একজন মহিলা বাজারে বসে কাঁচামাল বিক্রি করে সেজন্য শুনতে হয় অনেকের কটুকথা। আমার পরিবারের জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সাহায্য কামনা করছি। শুনেছি তার মেয়ে সায়রা ওয়াজেদ পুতুল প্রতিবন্ধীদের নিয়ে কাজ করে। আমি তাদের কাছে আমার মেয়ের ভবিষ্যতের জন্য সাহায্য চাচ্ছি। আমার সংসার দেখার মত কেউ নেই।

আমাদের মত মানুষদের কেউ সাহায্য সহযোগিতা করেন না। আমার এই মেয়ে বরিশালের মাননীয় সিটি মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহর ছবি এঁকেছে এবং বঙ্গবন্ধু-প্রধানমন্ত্রীর পরিবারের ছবিও এঁকেছে। আমার মেয়ে তামান্নার বড় ইচ্ছে এই ছবি নিজ হাতে প্রধানমন্ত্রী ও বিসিসি’র হাতে পৌছাতে চায়। ওর এই ইচ্ছে পুরণ হলে কিনবা ওর একটা গতি হলে আমরা স্বামী-স্ত্রী দুইজনে মরেও শান্তি পাবো।

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin