বরিশালে গুলিবিদ্ধদের খোঁজ নেয়নি কেউ : পরিবার

বরিশালে ১৮ আগস্ট রাতের ঘটনায় গুলিবিদ্ধ হয়ে চোখ হারানো আওয়ামী লীগের তিন নেতা এখনো কাতরাচ্ছেন হাসপাতালের বেডে। এরইমধ্যে ২২ আগস্ট রাতে ঘণ্টাব্যাপী বৈঠকে সমঝোতা হয়ে গেছে প্রশাসন আর আওয়ামী লীগের। সমঝোতার পর চার দিন ধরে শান্ত বরিশাল। ইউএনও-পুলিশের করা দুই মামলায় গ্রেফতার ২১ আসামির মধ্যে ৯ জনের জামিনও হয়ে গেছে।

কিন্তু চোখ হারানো তিন নেতার খবর নেয়নি কেউ। চিকিৎসা কিংবা অর্থ সহায়তা প্রশ্নেও কেউ যোগাযোগ করেনি। এই অভিযোগ তাদের পরিবারের সদস্যদের। একইসঙ্গে নিরাপত্তা আর ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কার কথাও জানিয়েছেন তারা। যদিও এসব অভিযোগ স্বীকার করেননি বরিশাল মহানগর আওয়ামী লীগের নেতারা। তাদের দাবি, দলের পক্ষ থেকে ইতোমধ্যে যোগাযোগ করা হয়েছে ঢাকায় চিকিৎসাধীন ওই ৩ নেতার পরিবারের সঙ্গে। সিটি মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহর পক্ষ থেকেও একজন প্রতিনিধি নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন।

গুলিবিদ্ধ তিন নেতা হলেন-নগরের ২৩নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি মনিরুল ইসলাম মনির, ১৬নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক তানভীর হাসান এবং সদর উপজেলার কাশিপুর ইউনিয়নের ৭নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য আতিকুর রহমান রায়হান। এদের প্রত্যেকেরই একটি করে চোখ নষ্ট হয়ে গেছে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসক। তাদের পরিবারের সদস্যরা জানান, সমঝোতা হওয়ার আগ পর্যন্ত পুলিশি হয়রানির ভয়ে লুকিয়ে লুকিয়ে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছিল তাদের। তবে ঘটনার এত দিনেও দলের পক্ষ থেকে কেউ কোনো যোগাযোগ করেনি তাদের সঙ্গে। তাদের খোঁজ নিতে কেউ হাসপাতালেও যায়নি।

গুলিবিদ্ধ তানভিরের বাবা মরহুম বীরপ্রতীক রফিকুল আহসান বাদশা। তার মা মোহসিনা পারভিন বলেন, ‘আমার ছেলের শরীরে অনেক স্প্লিন্টার ঢুকেছে। এর মধ্যে অধিকাংশ বের করা গেলেও তার ডান চোখে এখনো রয়ে গেছে ৫টি স্প্লিন্টার। চিকিৎসকরা বলেছেন, এগুলো আর বের করা যাবে না। আমার ছেলে ওই চোখ দিয়ে আর দেখতে পারবে না। আমি এই ঘটনায় জড়িতদের কঠোর শাস্তি দাবি করছি। একইসঙ্গে আমার ছেলের যাতে সুচিকিৎসা হয় তার ব্যবস্থা করারও দাবি জানাচ্ছি।’

গুলিবিদ্ধ মনিরের নিকটাত্মীয় জহিরুল ইসলাম বলেন, ‘মনিরের শরীরে মোট ৪২টি স্প্লিন্টার ঢুকেছে। নষ্ট হয়ে গেছে তার ডান চোখ। মেয়রের পায়ে গুলি লেগেছে শুনে তিনি উপজেলা পরিষদ কমপ্লেক্স এলাকায় ছুটে যান। খুব কাছ থেকে তাকে গুলি করেছে আনসাররা। ঘটনার পর বরিশাল শেরে বাংলা চিকিৎসা মহাবিদ্যালয় (শেবাচিম) হাসপাতাল থেকে তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় স্থানান্তর করা হলেও নিতে বাধা দেয় পুলিশ। পরে বহু কষ্টে অনেকটা লুকিয়ে ঢাকায় নেওয়া হয় তাকে। এরপর পুলিশ বেশ কয়েকবার মনিরের বাসায় গেছে। একপর্যায়ে ভয়ে আতঙ্কে তার পরিবারের সদস্যরাও আত্মগোপনে চলে যায়। যতদূর জানি এখন পর্যন্ত মনির কিংবা তার পরিবারের সঙ্গে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে কোনোরকম যোগাযোগ করা হয়নি।’

গুলিবিদ্ধ রায়হানের বাবা আমীর হোসেন বলেন, ‘মেয়রের গায়ে গুলি লেগেছে শুনেই ছুটে যায় রায়হান। রাত ১২টার পর খবর পাই যে তার গায়েও গুলি লেগেছে। ঘটনার সময় রায়হান ছিল কাশিপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান লিটন মোল্লার বাড়িতে একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে। ঘটনার পর লিটন মোল্লা ছাড়া আর কেউ আমার ছেলের কোনো খোঁজখবর নেয়নি। সমঝোতা-টমঝোতা বুঝি না, আমি আমার ছেলের চোখ ফেরত চাই। তাকে আগের মতো সুস্থ চাই।’ রায়হানের মা নূরজাহান বেগম বলেন, ‘দল করতে গিয়ে যদি ছেলের মৃত্যু বা অন্ধত্ব দেখতে হয় তবে এমন রাজনীতি আমরা চাই না। এতদিন হয়ে গেল কেউ কোনো খোঁজ নিল না। দুইটা টাকা দিয়েও সহায়তা করল না।’

এ বিষয়ে বরিশাল মহানগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সহসভাপতি ও বিসিসির প্যানেল মেয়র গাজী নঈমুল হোসেন লিটু বলেন, ‘কেউ তাদের কোনো খোঁজখবর নেয়নি এই অভিযোগ ঠিক নয়। ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান লিটন মোল্লা তো আমাদের দলের বাইরের কেউ নয়। তাছাড়া দলের পক্ষ থেকেও নানাভাবে তাদের খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে। এমনকি সিটি মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহ একজনকে দায়িত্ব দিয়েছেন নিয়মিত তাদের খোঁজখবর রাখার। যতদূর জানি মঙ্গলবারও মেয়রের প্রতিনিধি তাদেরকে দেখতে গিয়েছেন এবং তাদের কোনোরকম সহযোগিতা লাগবে কিনা জানতে চেয়েছেন। তারা বলেছেন যে আপাতত তাদের কোনো আর্থিক সহযোগিতা লাগবে না। এছাড়া সিটি মেয়র ইতোমধ্যে ঘোষণা দিয়েছেন যে প্রয়োজনে তাদেরকে বিদেশে নিয়ে চোখের চিকিৎসা করানো হবে। এক্ষেত্রে যত টাকা খরচ হবে তিনি তা ব্যক্তিগতভাবে বহন করবেন। অতএব কেউ যদি বলে যে তাদের কোনো খোঁজখবর নেওয়া হয়নি তাহলে সত্যি বলেননি।’

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin