ঢাকা-বরিশাল নৌরুটে চরম ঝুঁকিতে চলছে বিলাসবহুল লঞ্চ

ঢাকা-বরিশাল নৌরুট চরম ঝুঁকির মুখে পড়েছে। নদীপথের গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় পথনির্দেশক ‘বয়াবাতি’ নেই। যেগুলো আছে সেগুলো আবার রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে অকার্যকর। কোনোটা উলটে কাত হয়ে আছে।

আবার কোনোটি নিয়মানুযায়ী জ্বলেও না। কোথাও সেতুর উচ্চতা কম থাকায় ঝুঁকি নিয়ে বড় আকারের লঞ্চগুলো চলাচল করতে বাধ্য হচ্ছে।

এসব সমস্যা দূর করতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে একাধিকবার জানানো হলেও তা সমাধানে কোনো উদ্যোগ নেই। ফলে ঢাকা-বরিশাল নৌপথে দিন দিন ঝুঁকি বাড়ছে। নৌপথ সচল রাখতে প্রশাসনের কোনো মাথাব্যথাও নেই।

তবে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহণ কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) জানিয়েছে, যাত্রী ও পণ্যবাহী নৌযান চলাচল স্বাভাবিক রাখতে নিরলসভাবে কাজ করা হচ্ছে।

ঢাকা-বরিশাল নৌরুটে প্রায় ৪০ ফুট উচ্চতা ও ৩০০ ফুট দৈর্ঘ্যরে ডজনখানেক বিলাসবহুল লঞ্চ চলাচল করে।

নৌচালকদের কর্মদক্ষতার ওপর ভিত্তি করে লঞ্চগুলো চলে। আশঙ্কা প্রকাশ করে নৌযান চালকরা জানান, কয়েক মাস পর নদীতে পানি কমে যাবে। তখন ঝুঁকি আরও বাড়বে।

নৌযান শ্রমিক ফেডারেশনের ঢাকা অঞ্চলের সাধারণ সম্পাদক ও সুন্দরবন-১১ লঞ্চের চালক আলমগীর হোসেন জানান, ২০২০ সালে দুর্ঘটনায় ঢাকার বুড়িগঙ্গা সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।

সেই ঘটনার পর থেকে সেতুর উত্তর পাশের ছোট রুট দিয়ে খুব ঝুঁকির মধ্যে লঞ্চ চালানো হচ্ছে। এ রুটের দুই পিলারের মধ্যের জায়গা কম হওয়ায় সেতু অতিক্রমকালে দুর্ঘটনা এড়াতে মারাত্মক ঝক্কি পোহাতে হয়।

এছাড়া নির্বিঘ্নে লঞ্চ চলাচলের জন্য সেতুর যে ধরনের উচ্চতা দরকার-তা নেই। ঝুঁকি এড়াতে লঞ্চের উপরের অংশ কেটে উচ্চতা কমানো হলেও পানি বৃদ্ধির সময় দুর্ঘটনার আশঙ্কা থাকে।

এ বিষয়ে একাধিকবার সংশ্লিষ্ট দপ্তরসহ বিভিন্ন সংগঠনকে জানানো হয়েছে। কিন্তু কোনো সমাধান হয়নি। তিনি আরও বলেন, বরিশালের চরবাড়িয়া সংলগ্ন নদীতে দুটি বৈদ্যুতিক খুঁটি পড়েছিল।

সেই খুঁটি দুটির উপরের অংশ অপসারণ করলেও নিচের অংশ নদীতে রয়েছে। ওই স্থানে বিআইডব্লিউটিএ বাতি জ্বালিয়ে সংকেত দিলেও লঞ্চ ডানে-বায়ে ঘোরাতে গেলেই দুর্ঘটনার ঝুঁকি বেড়ে যায়। শীত মৌসুম আসার আগেই সেগুলো অপসারণ করা জরুরি।

জানা গেছে, একসময় মেঘনার মল্লিকপুর ক্যানেলে তিনটি বয়াবাতি ছিল। একটি বহুদিন ধরে জ্বলে না। আরেকটি স্রোতে ভেসে গেছে।

হিজলার লতারখালের মাঝখানে বয়াবাতি জ্বলে না। মেহেন্দিগঞ্জের রাবনের চরে লাল বয়াবাতি নিভে কাত হয়ে আছে। যাতে ধাক্কা লেগে যে কোনো মুহূর্তে মারাত্মক দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।

মাঝের চর নৌরুটের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত দুটি বয়াবাতি ছিল। কিন্তু এখন একটিও নেই। চাঁদপুরের মোহনপুরের আমিরাবাদ এলাকার নৌপথেও বয়াবাতি জ্বলে না।

বিভিন্ন রুটে বয়াবাতি না জ্বলায় রাতে বাল্কহেড চলাচলে ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়।

ঢাকা-বরিশাল নৌরুটের অ্যাডভেঞ্জার-৯ লঞ্চের চালক মো. আসলাম জানান, মিয়ারচর এলাকার নদীতে বয়াবাতি ১০-১২ দিন ধরে জ্বলে না। ফলে ওই এলাকা দিয়ে লঞ্চ চালানোয় দুর্ঘটনার আশঙ্কা থাকে।

একই নৌরুটে নিয়মিত চলাচলকারী মোতালেব মিয়া জানান, ব্যবসার কাজে সপ্তাহে একবার তিনি ঢাকা-বরিশাল নৌরুটে চলাচল করেন।

নৌপথের সঠিক দিকনির্দেশনা না থাকলে যে কোনো মুহূর্তে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। এ ঝুঁকি নিরসনে বিআইডব্লিউটিএ কর্তৃপক্ষকে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

বিআইডব্লিউটিএ বরিশালের বন্দর ও পরিবহণ বিভাগের উপ-পরিচালক মোস্তাফিজুর রহমান জানান, এ নৌরুটে যাত্রী ও পণ্যবাহী নৌযান চলাচল নির্বিঘ্ন করতে কয়েকটি বিভাগ কাজ করছে।

বিশেষ করে বন্দর পরিবহণ, নৌসংরক্ষণ ও পরিচালনা বিভাগ, নৌনিরাপত্তা ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা বিভাগ, ড্রেজিং বিভাগ নিরলসভাবে কাজ করছে।

বিআইডব্লিউটিএ বরিশালের নৌসংরক্ষণ ও পরিচালনা বিভাগের যুগ্ম পরিচালক আলী আজগর জানান, বরিশালের চরবাড়িয়াসংলগ্ন নদীতে দুটি বৈদ্যুতিক খুঁটির অবশিষ্ট অংশে প্রয়োজনীয় নৌসাংকেতিক চিহ্ন দেওয়া আছে।

এখানে দুর্ঘটনার কোনো আশঙ্কা নেই। খুঁটির অবশিষ্টাংশ অপসারণের জন্য চিঠি দিয়ে বাংলাদেশ পাওয়ার গ্রিড কোম্পানিকে জানানো হয়েছে। এগুলো শিগগিরই অপসারণ করা হবে বলে তিনি আশা করেন।

তিনি আরও বলেন, নৌপথের যেসব স্থানে বয়াবাতি জ্বলে চালকরা জানালে সেগুলো ঠিক করে দেওয়া হবে। বুড়িগঙ্গা সেতু অতিক্রমকালে সৃষ্ট সমস্যার বিষয়টি তার দপ্তরের আওতাধীন না হওয়ায় তিনি কোনো মন্তব্য করেননি।

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin