পাখা মেল‌ছে পায়রা !

রফিকুল ইসলাম, বরিশাল ‍॥ স্রোতস্বিনী পায়রা নদীতে শ্যাওলা জমে না। প্রবল গতিতে নুড়ি (ছোট) পাথরও ছিটকোয়। পানির চাপে সব ছোট পাথর বালুর নীচে পড়ে থাকে। সব বাঁধা টপকে বঙ্গোপসাগরকে সামনে রেখে পায়রা এগোয় অবাধে। পায়রার ছুটে চলার তেজে উড়ে যায় সব বাঁধা। সেই স্রোতস্বিনী পায়রার দুই তীর শাসন করে নির্মিত সেতুর কাজ প্রায় শেষের মুখে।

ফলে দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান হতে চলেছে। বিভাগীয় শহর বরিশাল আর সমুদ্রসৈক কুয়াকাটাকে জুড়বে এই সেতু। এর ফলে একদিকে যেমন পদ্মা ও পায়রা সেতু উন্মুক্ত হয়ে গেলে, অপরদিকে বরিশাল অঞ্চল শিল্প-বাণিজ্য এবং অর্থনৈতিক কর্মকা-ে এগিয়ে যাবে। এছাড়াও সড়ক পথে সরাসরি যুক্ত হচ্ছে পর্যটনকেন্দ্র কুয়াকাটা।

ঢাকা থেকে বরিশাল হয়ে সমুদ্রসৈকত কুয়াকাটা যেতে এখনো দুটি নদীতে ফেরি পারাপার হতে হয়। একটি পদ্মা, অন্যটি পায়রা। নদী পারাপারে দীর্ঘ সময় লাগার পাশাপাশি যাত্রীদের ভোগান্তি পোহাতে হয়। পদ্মা সেতুর কাঠামো দাঁড়িয়ে গেছে।

সরকার ও সেতু প্রকল্পের বিশেষজ্ঞদের আশা, জটিল কাজ সব শেষ হয়ে যাওয়ায় দেড় বছরের মধ্যে সেতুটি চালু করা যাবে। বাকি থাকে পায়রা। সেখানেও আশার খবর, পায়রা সেতুটি এ বছরের সে‌প্টেম্ব‌রে উন্মুক্ত হতে যাচ্ছে। ফলে ঢাকা-কুয়াকাটার পথের কাঁটা ফেরী যাচ্ছে যাদুঘরে।

করোনা মহামারির কারণে এই সেতুর নির্মাণকাজের অগ্রগতি নিয়ে যে অনিশ্চয়তার সৃষ্টি হয়েছিল, এখন আর তা নেই। এরই মধ্যে পাযয়রার মূল সেতুটির অবকাঠামোর কাজ প্রায় ৯০ ভাগ শেষ হয়েছে। আনুষঙ্গিক কাজও এগিয়ে চলছে সমানতালে।

সেতুটির মূল কাঠামো এখন দৃশ্যমান হয়ে গেছে। দুই পাড়ের সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে গেছে এর কাঠামো। এই সেতুটি চালু হলে বরিশাল থেকে কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকতে যেতে আর ফেরি ব্যবহার করতে হবে না। পায়রা বন্দর, কৃষি ও মৎস্যকেন্দ্রিক অর্থনীতিও গতি পাবে।

চালু হচ্ছে সে‌প্টেম্ব‌রে

বরিশাল পটুয়াখালী মহাসড়কে বাকেরগঞ্জের সীমান্ত লেবুখালীর পায়রা নদীতে নির্মাণাধীন পায়রসেতু কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। এখন চলছে অলংকরণের কাজ। দৃষ্টিনন্দন এই সেতুটি পর্যটন এর কথা মাথায় রেখেই নির্মান করা হয়েছে। সেতুটি নির্মানের মধ্যে দিয়ে সমূদ্র সৈকত কুয়াকাটায় যেতে আর কোনো ফেরী বিলম্ব থাকবেনা।

শুক্রবার সন্ধ্যায় পরীক্ষামূলক এই সেতুর লাইট জ্বালানো হয়েছিল। মুহুর্তেই নদীর পটে ছড়িয়ে পরে এক হৃদয় ছোঁয়া বর্ণিল আবেশ, দর্শনার্থীরা ছবি তুলে তা ছড়িয়ে দেয় ফেসবুকে।খুব শিগগিরই এই সেতু উন্মুক্ত করে দেয়া হবে বলে জানিয়েছে সূত্র।

জলতল থেকে সেতুটি নদীর ১৮ দশমিক ৩০ মিটার উঁচু হবে। বাতি জ্বলবে সৌরবিদ্যুতের সাহায্যে। ২০১৬ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পায়রা সেতুর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। চীনের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান লংজিয়ান রোড অ্যান্ড ব্রিজ কনস্ট্রাকশন সেতুটি নির্মাণে কাজ করছে। এর নির্মাণব্যয় ধরা হয়েছে এক হাজার ৪৪৬ কোটি টাকা।

পায়রা সেতুর প্রকল্প পরিচালক মোহাম্মদ আবদুল খালেক বলেন, করোনাভাইরাস সংক্রমণের কারণে কিছুটা বিলম্ব হয়েছিল। তবুও ইতিমধ্যে মূল সেতুটির কাজ শেষ। বাকি কাজও দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে। তবে বর্তমানে নদীশাসনের কাজে কিছুটা ধীরগতি দেখা দিয়েছে। শ্রমিক–সংকটে এই ধীরগতি হচ্ছে। এই মাসের সেতু যান চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হবে। নির্মাণাধীন সেতুর উত্তরে বরিশালের বাকেরগঞ্জের লেবুখালী এবং দক্ষিণে পটুয়াখালীর দুমকি উপজেলা।

ওই কর্মকর্তা আরো বলেন, এ সেতু নির্মাণের নকশা কিছুটা ব্যতিক্রমধর্মী। চার লেনবিশিষ্ট সেতুটি নির্মিত হচ্ছে এক্সট্রাডোজড কেব্ল-স্টেইড প্রযুক্তিতে। চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর ওপর শাহ আমানত সেতুও এই প্রযুক্তিতে নির্মিত। এক হাজার ৪৭০ মিটার দৈর্ঘ্য ও ১৯ দশমিক ৭৬ মিটার প্রস্থের সেতুটি কেব্ল দিয়ে দুই পাশে সংযুক্ত থাকবে। উভয় পাড়ে সাত কিলোমিটারজুড়ে নির্মাণ করা হবে সংযোগ সড়ক। নদীর মাঝখানে মাত্র একটি পিলার ব্যবহার করা হয়েছে। এতে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ঠিক থাকবে।

টোল নির্ধারণ

সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ সেতুর ওপর দিয়ে যান চলাচলের জন্য টোল নির্ধারণ করে গত ২১ মার্চ একটি গেজেট প্রকাশ করেছে। সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের (টোল অধিশাখা) উপসচিব ফাহমিদা হক খানের সই করা ওই গেজেটে পায়রা সেতুতে ট্রেইলারের টোল ৯৪০ টাকা, হেভি ট্রাক ৭৫০ টাকা, মিডিয়াম ট্রাক ৩৭৫ টাকা, বড় বাস ৩৪০ টাকা, মিনি ট্রাক ২৮০ টাকা, কৃষিকাজে ব্যবহৃত যান ২২৫ টাকা, মিনিবাস-কোস্টার ১৯০ টাকা, মাইক্রোবাস ১৫০ টাকা, ফোর হুইল চালিত যানবাহন ১৫০ টাকা, সিডান কার ৯৫ টাকা, ৩-৪ চাকার মোটরাইজড যান ৪০ টাকা, মোটরসাইকেল ২০ টাকা, রিকশা, ভ্যান, সাইকেল, ঠেলাগাড়ি ১০ টাকা টোল নির্ধারণ করা হলো বলে জানানো হয়েছে।

বরিশাল চেম্বার অব কমার্স এ্যান্ড ইন্ডাট্রিজ এর সভাপতি সাইদুর রহমান রিন্টু বলেন, অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে দক্ষিণাঞ্চল পিছিয়ে থাকার জন্য অবকাঠামোর দুর্বলতাই প্রধানত দায়ী। তিনি আরো বলেন, পদ্মা ও পায়রা সেতু চালু হলে এই দুর্বলতা ঘুচে যাবে। পায়রা বন্দর এক অনন্য অর্থনৈতিক সম্ভাবনা সূচনা করবে।

পায়রা বন্দর শুধু দক্ষিণাঞ্চল কিংবা দেশের নয়, দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলবে। ট্রানজিট সুবিধার আওতায় প্রতিবেশী দেশ পায়রা বন্দর ব্যবহার করতে পারবে। তাছাড়া পায়রা সেতুর নির্মাণ সমাপ্তির মধ্য দিয়ে পর্যটন কেন্দ্র কুয়াকাটার সাথে সারা দেশের নিরবচ্ছিন্ন সড়ক যোগাযোগ একধাপ এগিয়ে যাবে।

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin