বরিশালে মুক্তিযোদ্ধাকে আটকে নির্মম নির্যাতন

বরিশালের বাবুগঞ্জে পূর্ব শত্রুতার জের ধরে দীর্ঘ ১৬ বছর পরে গ্রামে ফেরা এক বৃদ্ধ মুক্তিযোদ্ধাকে খুঁটির সাথে বেঁধে নির্মম নির্যাতন চালানোর অভিযোগ পাওয়া গেছে। আ. মজিদ সরদার (৭২) নামে ওই বৃদ্ধ মুক্তিযোদ্ধাকে পিস্তল ঠেকিয়ে দেশীয় অস্ত্র দিয়ে হাত-পা কুপিয়ে জখমসহ পিটিয়ে মারাত্মকভাবে আহত করা হয়েছে। একই সাথে ওই মুক্তিযোদ্ধার সাথে থাকা মো. আজাহার ওরফে মনু (৬৫) নামে আরেক বৃদ্ধকে হাঁতুড় দিয়ে পেটানো হয়।

রোববার (৫ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যা ৭টার দিকে উপজেলার বীরশ্রেষ্ঠ জাহাঙ্গীরনগর (আগরপুর) ইউনিয়নের ঠাকুরমল্লিক গ্রামের কবিরাজ বাড়ি সংলগ্ন এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। ওই ইউপির সাবেক চেয়ারম্যান সরদার তারেকুল ইসলাম তারেক (৫২) এর নেতৃত্বে ওই বৃদ্ধ বীর মুক্তিযোদ্ধা ও তার সাথে থাকা অপর বৃদ্ধের ওপর হামলা চালানো হয়। এতে উভয় বৃদ্ধ গুরুত্বর আহত হয়ে বরিশাল শের-ই বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এ ঘটনায় মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে।

আহত সূত্রে জানা গেছে, দীর্ঘ ১৬ বছর পরে রোববার সন্ধ্যা ৭টার দিকে মুক্তিযোদ্ধা মজিদ সরদার তার সহযোগী আজাহার ওরফে মনুকে সাথে নিয়ে বীরশ্রেষ্ঠ জাহাঙ্গীরনগর (আগরপুর) ইউনিয়নের ঠাকুরমল্লিক গ্রামের সরদার বাড়ি নিজ পিত্রালয়ে যাচ্ছিলেন। পথিমধ্যে স্থানীয় কবিরাজ বাড়ি সংলগ্ন কামরুল কবিরাজের চায়ের দোকান অতিক্রমকালে সেখানে পূর্ব থেকে আড্ডারত একদল সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা মুক্তিযোদ্ধা মজিদ সরদার ও তার সাথে থাকা আজাহার ওরফে মনুকে আটক করে। একপর্যায়ে তাদের ওপর প্রকাশ্যে হামলা চালায়। হামলাকারীরা সকলেই উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি খালেদ হোসেন স্বপন এবং তার সহোদর সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান তারেকুল ইসলাম তারেক অনুসারী।

আহত সূত্রে আরও জানা গেছে, মুক্তিযোদ্ধা মজিদ সরদার ও আজাহার ওরফে মনুর ওপর সাবেক চেয়ারম্যান তারেকুল ইসলাম তারেক নেতৃত্বে হামলা চালানো হয়েছে। হামলাকারীরা হলেন- সাবেক চেয়ারম্যান তারেকের সহযোগী শহিদুল খান (৪০), হানিফ হাওলাদার (৪২), হাসান ডাক্তার (২৫), সজল হাওলাদার (২৮), রানা জমাদ্দার (২৭), সুজন শরীফ (৩১), বাদল বিশ্বাস (৪৫), ফেরদৌস সরদার (৩৮), মিন্টু খান (৪২), মিলন (৩২), রানা হাওলাদার (৩৫), সাবেক ইউপি সদস্য কাইয়ুম হাওলাদার (৪৫) ও মিজান মোল্লাসহ কমপক্ষে ২০ থেকে ২৫ জন। এমনকি চেয়ারম্যান তারেক নিজেও এই হামলায় অংশ নিয়েছেন।

বরিশাল শের-ই বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আহত মুক্তিযোদ্ধা আ. মজিদ সরদার সাংবাদিকদের জানান, চায়ের দোকানের সামনে মারধর করে হামলাকারীরা তাকে এবং মনুকে ধরে নিয়ে যায় সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান তারেকুল ইসলাম তারেকের বাড়ি। সেখানে নিয়ে তাকে (মজিদ) ও আজাহার ওরফে মনুকে লাঠিসোটা-লোহার রড ও হাতুড়ি দিয়ে এলোপাথারি পিটিয়ে গুরুত্বর আহত করা হয়।

তিনি আরও জানান, সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান তারেকুল ইসলাম তারেক নিজে তার (মুক্তিযোদ্ধা মজিদ) বাম হাতের আঙুল হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে থেতলে দিয়েছেন। লোহার রড দিয়ে কুপিয়ে বাম পায়ের হাঁটুর নিচে রক্তাক্ত জখম করেছেন। মারধরের একপর্যায়ে আগরপুর তদন্ত কেন্দ্রের পুলিশ সদস্যরা তাদেরকে আহতাবস্থায় তারেক চেয়ারম্যানের বাড়ি থেকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করে।

হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অপর আহত বৃদ্ধ আজাহার ওরফে মনু বলেন, ‘তিনি মুক্তিযোদ্ধা মজিদ সরদারের সাথে কবিরাজ বাড়ি সংলগ্ন সরদার বাড়িতে যাচ্ছিলেন। পথমধ্যে সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান তারেকুল ইসলাম তারেকের সন্ত্রাসী বাহিনী তাদের ওপর অতির্কিত হামলা চালায়। পরে তাকে ও মুক্তিযোদ্ধা মজিদ সরদারকে চেয়ারম্যান তারেকের বাসায় নিয়ে যায় হামলাকারীরা। সেখানে নিয়ে তারেকের সন্ত্রাসী গ্রুপের লোকজন তাকেসহ মুক্তিযোদ্ধাকে বেধরক মারধর করে। একপর্যায়ে চেয়ারম্যানের লোকজন চেয়ারের সাথে তাকে বেঁধে হাত-পায়ের নখসহ আঙুল প্লাজ (লোহার যন্ত্র) দিয়ে থেতলে দেয়।’

তিনি আরও জানান, ‘মারধরের সময় বারবার চেয়ারম্যান তারেকের লোকজন আমাদের বলে ‘তোরা হিমু খানের লোক (বর্তমান চেয়ারম্যান)। তার সাথে তোদের ভালো সম্পর্ক। তোরা তারেক চেয়ারম্যানকে হত্যার উদ্দেশ্যে এখানে আসছো এই কথা বলে হাতুড়ি দিয়েও পিটিয়েছে। শরীরের এমন কোন স্থান নেই যেখানে আঘাতের চিহ্ন নেই।

এদিকে মুক্তিযোদ্ধা মজিদ সরদার ও তার সাথে থাকা আজাহার ওরফে মনুকে মারধরের অভিযোগ অস্বীকার করে বীরশ্রেষ্ঠ জাহাঙ্গীরনগর (আগরপুর) ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান সরদার তারেকুল ইসলাম তারেক বলেন, হামলা বা নির্যাতনের কোন ঘটনা ঘটেনি। উল্টো অভিযোগ তুলে সাবেক এই চেয়ারম্যান বলেন, উল্লেখিত দুই ব্যক্তিসহ কমপক্ষে ৮ জনের একটি সন্ত্রাসীদল তাকে হত্যার উদ্দ্যেশে তার এলাকায় অবস্থান নিয়েছিলো। বিষয়টি এলাকাবাসী আঁচ করতে পেরে ওই সকল সন্ত্রাসীদের ধাওয়া দেয়। এ সময় অন্যান্যরা পালিয়ে গেলেও মজিদ সরদার ও মনুকে ধরা পড়লে এলাকার লোকজন তাদেরকে মারধর করে। বিষয়টি তিনি জানতে পেরে সংশ্লিষ্ট থানায় খবর দিলে পুলিশ ঘটনাস্থলে এসে মজিদ ও মনুকে উদ্ধার করে নিয়ে যায়। এ ঘটনায় সোমবার (৬ সেপ্টেম্বর) বিকেলে তিনি (সাবেক চেয়ারম্যান তারেক) নিজে বাদী হয়ে মজিদ ও মনুসহ বেশ কয়েকজনের নাম উল্লেখ বাবুগঞ্জ থানায় এজাহার দাখিল করেছেন।

বাবুগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মাহবুবুর রহমান জানান, মারধরের শিকার বৃদ্ধ মজিদ সরদার বীরশ্রেষ্ঠ জাহাঙ্গীরনগর (সাবেক আগরপুর) ইউপির সাবেক চেয়ারম্যান সরদার তারেকুল ইসলাম তারেকের পিতার হত্যা মামলার আসামি। মজিদ সরদার ও সাবেক চেয়ারম্যান তারেক একই বাড়ির বাসিন্দা হলেও দীর্ঘদিন পরে মজিদ সরদার গ্রামে ঢুকলে চেয়ারম্যান তারেক অনুসারীদের সন্দেহ হয়। যার কারণে চেয়ারম্যান তারেক অনুসারীরা মজিদ সরদারসহ তার সাথে থাকা মনুকে মারধর করেছে। এ ঘটনায় এখনও পর্যন্ত কোনো মামলা দায়ের হয়নি।

অপরদিকে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রতিপক্ষের হামলায় আহত মুক্তিযোদ্ধা আ. মজিদ সরদার উপজেলার বর্তমান বীরশ্রেষ্ঠ জাহাঙ্গীরনগর (সাবেক আগরপুর) ইউপির ঠাকুরমল্লিক গ্রামের মৃত আব্দুল হক সরদারের ছেলে। ২০০৫ সালে ১৫ এপ্রিল ভোর রাতে তৎকালীন ইউপি চেয়ারম্যান ও বর্তমান বাবুগঞ্জ উপজেলা আ’লীগের সভাপতি খালেদ হোসেন সরদার স্বপনের পিতা আবুল কাসেম সরদারকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় দায়েরকৃত মামলায় এই মুক্তিযোদ্ধা মজিদ সরদারকে আসামি করা হয়। ওই মামলায় বরিশাল জেলা ও দায়রা জজ আদালত মুক্তিযোদ্ধা মজিদ সরদারসহ ১০ আসামি যাবজ্জীবন সাজা দেয়। পরবর্তীতে উচ্চ আদালত ওই হত্যা মামলা থেকে মুক্তিযোদ্ধা মজিদ সরদারকে খালাস পান। তবে এর আগে কাসেম সরদার হত্যা মামলায় আসামি হওয়ার পর থেকেই দীর্ঘ ১৬ বছর ধরে নিজ গ্রাম ছেড়ে দূরে বসবাস করে আসছিলেন মুক্তিযোদ্ধা মজিদ সরদার। তিনি নিহত কাসেম সরদারের ছেলে সদ্য সাবেক বাবুগঞ্জ উপজেলা চেয়ারম্যান খালেদ হোসেন সরদার স্বপন ও সরদার তারেকুল ইসলাম তারেকসহ তাদের সন্ত্রাসী বাহিনীর অত্যাচারে ২০০৫ সালেই নিজ গ্রামের বাড়ি ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন। সেই থেকে রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্নস্থানে বসবাসের পর রোববার (৫ সেপ্টেম্বর) নিজ পিত্রালয়ে এসেছিলেন।

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin