অনাদর-অবহেলার ৪২ বছর: বরিশাল বিমানবন্দর সবার পেছনে

আকাশ থেকে ফসলের জমিতে কীটনাশক ছিটানোর কাজে ব্যবহৃত এক ইঞ্জিনের বিমানের রেস্ট ও রিফুয়েলিং পয়েন্ট থেকে আজকের বরিশাল বিমানবন্দর। মাঝে প্রায় ৬০ বছর পেরিয়ে গেলেও যেন একই জায়গায় পড়ে আছে বিমানবন্দরটি। দেশের অন্যসব বিমানবন্দরের সঙ্গে তুলনা করলে এখানে কোনো কিছুই মিলবে না।

দৈনিক ৭-৮টি ফ্লাইট চললেও বিমানবন্দরটির উন্নয়ন-সম্প্রসারণ কিংবা আধুনিকীকরণসহ সবকিছুই যেন রহস্যজনক কারণে থমকে আছে। বিমানের ওঠানামা থেকে শুরু করে সবকিছুতেই যাত্রীদের নানা দুর্ভোগ পোহাতে হয়। সবকিছুতেই যেন সবার পেছনে বরিশাল বিমানবন্দর।

বরিশালসহ দক্ষিণাঞ্চলের ১১ জেলার সঙ্গে ঢাকার উড়ালপথে যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম বিমানবন্দরটি পাকিস্তান আমলে এয়ার স্ট্রিপ হিসাবে যাত্রা শুরু করে। এক ইঞ্জিনবিশিষ্ট বিমান ওঠানামার জন্য তখন বরিশাল নগরী থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে একটি ছোট্ট রানওয়ে নির্মাণ করা হয়। ফসলি জমিতে আকাশ থেকে বিমানের মাধ্যমে কীটনাশক ছিটানো হতো। একটানা খুব বেশি সময় উড়তে না পারা বিমানগুলোর রেস্ট ও রিফুয়েলিংয়ের জন্য এটি ব্যবহার হতো।

মুক্তিযুদ্ধের শেষের দিকে পাকিস্তানি বাহিনীর বোমারু বিমানের গোলায় ক্ষতিগ্রস্ত স্ট্রিপটিকে সংস্কারের পর এক ইঞ্জিনের বিমান ওঠানামায় আরও বেশ কয়েক বছর ব্যবহার করা হয়। এরপর এটি পরিত্যক্ত হয়। ১৯৭৯ সালের দিকে শর্ট টেক-অফ ল্যান্ডিং বা স্টল সার্ভিসের যাত্রীবাহী বিমান ওঠানামার জন্য এখানে ২ হাজার ৮০০ ফুট দৈর্ঘ্যরে রানওয়ে তৈরি করা হয়। কিছুদিন স্টল সার্ভিসের ছোট বিমান ঢাকা-বরিশাল রুটে যাত্রী পরিবহণ করলেও পরে বন্ধ হয়ে যায়। পরবর্তী সময়ে প্রায় ৪০ বছর চালু ও বন্ধ করার মধ্য দিয়ে বিমানবন্দরটি টিকে রয়েছে। পরিস্থিতির বদল হলেও ভাগ্য বদলায়নি বন্দরটির।

বাংলাদেশের সবচেয়ে ছোট রানওয়ের বিমানবন্দর হলো বরিশাল বিমানবন্দর। এখানে রানওয়ের দৈর্ঘ্য মাত্র ৬ হাজার ফুট। এত ছোট রানওয়েতে অভ্যন্তরীণ রুটের বিমানের উড্ডয়ন-অবতরণে কষ্ট হয়। এখানে বড় বিমানের ওঠানামা প্রায় অসম্ভব। ২০০৭ সালে সিডরের তাণ্ডবে দক্ষিণ উপকূল বিধ্বস্ত হলে ছোট রানওয়ের জটিলতা বড় হয়ে দেখা দেয়। সেসময় ত্রাণ পরিবহণের কাজে বিমানবন্দরটি ব্যবহৃত হয়। রানওয়ে ছোট হওয়ায় বিদেশি অনেক বিমান এখানে নামতে পারেনি। ফলে ঢাকায় ত্রাণ নামিয়ে তা দক্ষিণে পাঠাতে হয়।

বরিশাল নাগরিক সমাজের সদস্য সচিব ডা. মিজানুর রহমান বলেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগপ্রবণ এলাকা দক্ষিণাঞ্চলে প্রায় প্রতিবছর ঝড়-জলোচ্ছ্বাসের সৃষ্টি হয়। এরকম ক্ষেত্রে জরুরি সহায়তার বিষয়টি মাথায় রেখে হলেও দক্ষিণাঞ্চলের একমাত্র বিমানবন্দরটির রানওয়ে বড় করা খুবই জরুরি। এখানে যে টার্মিনাল ভবন রয়েছে, সেটিও বেশ পুরোনো। দৈনিক ৭-৮টি ফ্লাইটে আসা-যাওয়া করা যাত্রীদের জন্যও এটি অপ্রতুল। ১৯৯১ সালে নেওয়া প্রকল্পের আওতায় নির্মিত টার্মিনাল ভবনের ব্যবহার ১৯৯৫ সালে শুরু হয়। তখন এ বন্দর দিয়ে সপ্তাহে মাত্র দুইদিন বিমান চলাচল করত। তখনকার তুলনায় বর্তমানে প্রায় ২০ গুণ বেশি যাত্রী চলাচল করলেও আয়তন আর বাড়েনি টার্মিনালের। গাড়ি পার্কিংয়ের জায়গাটিও তার ধারণক্ষমতা হারিয়েছে বহু বছর আগে।

পরিচয় গোপন রাখার শর্তে বিমানবন্দরের একাধিক কর্মকর্তা বলেন, বিমান উড্ডয়ন ও অবতরণের কারণে যাত্রীদের ভিড় সামলাতে আমাদের হিমশিম খেতে হয়। এমন সময় যাত্রীদের নিয়ন্ত্রণ করা রীতিমতো কঠিন হয়ে পড়ে। এখানে বিমানের ওঠানামার সব সুবিধা অনুপস্থিত। রানওয়ে এত ছোট যে পাশাপাশি দুটি বিমানের অবস্থান করতেও অসুবিধা হয়। এখানকার অ্যাপ্রোনের আকার ২০০ ফুট প্রস্থ ও ২৫০ ফুট দৈর্ঘ্যরে।

সিভিল এভিয়েশনের প্রকৌশল বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, ইন্টারন্যাশনাল সিভিল এভিয়েশন অর্গানাইজেশনের (আইটিএও) নীতিমালা অনুযায়ী যে কোনো বিমানবন্দরে রানওয়ের কেন্দ্র থেকে দুইদিকে অন্তত ৫০০ ফুটের মধ্যে কোনো স্থাপনা থাকতে পারবে না। কিন্তু এখানে ২০০ ফুটের মধ্যে নিরাপত্তাবেষ্টনী রয়েছে।

এছাড়া ১৬০ একর জমির ওপর নির্মিত বিমানবন্দরটি নিরাপত্তার দিক থেকে ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করে আইটিএও। তাদের সুপারিশ অনুযায়ী রানওয়ে সম্প্রসারণসহ অবকাঠামোগত ঝুঁকি দূর করতে এর আয়তন ৩২৫ একর বাড়াতে হবে। একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, এখানে বিমান ওঠানামায় ব্যবহৃত ল্যান্ডিং ইকুইপমেন্টও আধুনিক নয়।

বিমানের এক পাইলট জানান, আইএলএস থাকলে ঘন কুয়াশা কিংবা পাইলট অসুস্থবোধ করলেও অটো পাইলটে খুব সহজে বিমান অবতরণ করতে পারে। দেশের যেসব বিমানবন্দরে এখনো আইএলএস নেই, সেখানে অন্তত ডিভি ওয়্যার আছে। এ সিস্টেমেও বিমান উড্ডয়ন কিংবা অবতরণে খুব একটা সমস্যা হয় না। বরিশাল বিমানবন্দরের এনডিবি পুরোনো হওয়ায় অনেক সময় উড্ডয়ন ও অবতরণে মানসিক চাপে পড়তে হয়।

বিষয়টি নিয়ে আলাপকালে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল এম মফিদুর রহমান বলেন, আইএলএস সিস্টেম তো বাংলাদেশের কোনো বিমানবন্দরেই নেই। এছাড়া বরিশাল বিমানবন্দরে বর্তমানে যে সিস্টেম রয়েছে, একে খুব বেশি পুরোনো বলা যাবে না। আমরা বর্তমানে সেখানে পারফরম্যান্স বেইজড ল্যান্ডিং সিস্টেম চালু করেছি। এটা যথেষ্ট আধুনিক। এ সিস্টেমে উড্ডয়ন ও অবতরণে কোনো সমস্যা হওয়ার কথা নয়।

এক কর্মকর্তা বলেন, দেশের প্রায় সব বিমানবন্দরে বর্তমানে উন্নয়ন ও সম্প্রসারণের কাজ চলছে। এসব কাজে হাজার হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দিচ্ছে সরকার। অথচ এখানে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে মেরামত ও সংস্কারের জন্য কিছু টাকা দেওয়া হয়েছিল। এরপর আর কোনো খবর নেই।

এ ব্যাপারে বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সচিব মোকাম্মেল হোসেন বলেন, বরিশাল বিমানবন্দর সম্প্রসারণসহ আধুনিকীকরণের পরিকল্পনা রয়েছে। ইতোমধ্যে এ সংক্রান্ত জরিপ হয়েছে। তবে করোনার কারণে কাজে কিছুটা ধীরগতি তৈরি হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, সিভিল এভিয়েশনে খুব শিগগিরই দেড় হাজারের বেশি লোক নিয়োগ দেওয়া হবে। জানা যায়, বরিশাল বিমানবন্দরে ১২২ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর পদ থাকলেও আছেন মাত্র ৬২ জন। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসন ভবনগুলোর অবস্থাও করুণ। নতুন ভবন নির্মাণ করা হলেও বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া হয়নি।

বিমানবন্দরের নিরাপত্তাবেষ্টনীর অনেকটা অংশ ভাঙা। কেবল জীবজন্তুই নয়, মানুষও ঢুকে পড়ে রানওয়েতে। কিছুদিন আগে এরকম একটি ঘটনায় ইউএস-বাংলার একটি বিমান রানওয়েতে নামতে না পেরে বেশ কিছুক্ষণ আকাশে চক্কর কাটতে হয়। সেবার রানওয়েতে ঢুকে পড়েছিল কুকুর।

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin