ভরা মৌসুমে পোর্ট রোড মোকামে ইলিশের আকাল

ইলিশের ভরা মৌসুমে পোর্টরোড মোকামে চলছে আকাল। বিগত বছরের এই সময়ে ইলিশের জমজমাট বেচা কেনা হলেও এ বছর খুচরা ক্রয়ের জন্যও পাওয়া যাচ্ছে না। মৌসুমের প্রায় শুরু থেকেই এ আকাল চলছে। যা গতকাল বৃহস্পতিবার চরমে পৌছেছে। ইলিশকে স্বাচ্ছন্দ্যে ডিম ছাড়ার সুযোগ দিতে ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা শুরুর আর মাত্র ৩ দিন বাকি। কিন্তু বর্তমানের ভরা মৌসুমে আনন্দ নেই কারো মনে। বিভিন্ন কারনে এ সমস্যা হচ্ছে বলে জানিয়েছে পোটর্ রোড ইলিশ মোকামের আড়তদার, কমিশন এজেন্ট সহ খুচরা ও পাইকারী বিক্রেতারা। অন্যদিকে ইলিশ প্রেমী বরিশালের ক্রেতারাও বেশ নারাজ বাজারে ইলিশের স্বল্পতায়। কারন মাছের আমদানী একবারেই সীমিত হওয়ায় চড়া দামে কিনতে হচ্ছে তাদের। গতকাল সকালে পোর্ট রোড ইলিশ মোকামে দেখা গেছে, বাজার ভরা হতাশ ক্রেতা। খুচরা বাজারে বিক্রির জন্য সকাল থেকে হাতে গোনা কিছু ইলিশ ছিল বাজারে। একটি মাত্র ফিশিং বোট ইলিশ নিয়ে ঘাটে ভিড়েছে। সেখানে ছিলনা তেমন মানসম্মত ইলিশ। বছরের এই সময়টি মুলত ইলিশের ভরা মৌসুম হিসেবে দেখা হয়। গত বছরের আগের বছরও ঠিক এই সময়ে ইলিশে রমরমা ছিল মোকাম। ৮শ থেকে ১ হাজার মন এমনকি এর চাইতেও বেশি ইলিশ এসেছে গড়ে প্রতিদিন মোকামে। কিন্তু এ বছর এর চিত্র একবারেই হতাশাজনক। আড়তদাররা রপ্তানীর জন্য কেনার ইলিশ পাচ্ছে না। কিছু ইলিশ ঘাটে এলেও তা একেবারেই অপ্রতুল পরিমানের। রপ্তানীর জন্য এক রকমের কারাকারি করে এই ইলিশ কিনতে হচ্ছে আড়তদার ও কমিশন এজেন্টদের। দুই তিন আগের ইলিশ আজকের শিকার করা জানিয়ে খুচরা ক্রেতাদের কাছে বিক্রি করতে দেখা গেছে। সেখানে গ্রেড ও জাটকাসহ সকল সাইজের ইলিশ ছিল। মাছের স্বল্পতা ও ক্রেতাদের চাহিদার কারনে এই মাছ বিক্রি করা হয় চড়া দামে। খুচরা বাজারে গতকাল পোর্টরোডে ১ থেকে দেড় কেজি ওজনের ইলিশ দেড় হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়েছে। দাম বেশি হলেও খুচরা বাজারের এই মাছ তাজা ছিল না বলে অভিযোগ করেছে ক্রেতারা। অন্যদিকে এলসি সাইজের মাছ এর প্রতি কেজি বিক্রয়মূল্য ছিল ৭শ থেকে ১ হাজার টাকা। জাটকা কেজি বিক্রি হয়েছে ৫শ থেকে ৭শ টাকা করে। খুচরা বিক্রেতা সঞ্জয় জানায় নদীতে মাছ নেই বলেই চলে। কোন বোট মাছ নিয়ে আসছে না। যা আসছে তা চাহিদার তুলনায় খুবই স্বল্প। এজন্য দুদিন আগের মাছও বিক্রি করছেন। পাইকারী বাজার তো দুরের কথা এখন মাছের যে আমদানী তাতে খুচরা বাজারের চাহিদাও মিটছে না। সকাল থেকে অনেক ক্রেতাকে মাছ না পেয়ে অন্য বাজারে চলে যেতে দেখেছেন। তবে তাতেও লাভ নেই। কারন নদীতে মাছ নেই, বাজারে মাছ আসবে কোথা থেকে।
পোর্টরোড সাততলা ঘাট সংলগ্ন সেকান্দার আলী সিকদার মৎস্য আড়তের শাকিল জানান, একটি মাত্র বোট গতকাল মাছ নিয়ে ঘাটে এসেছে। তাতে মাছ ছিল চাহিদার তুলনায় নগন্য পরিমানের। বর্তমানে নদীর ইলিশ দাম সম্পর্কে তিনি বলেন, দেড় কেজি ওজনের ইলিশের মন ছিল ৫৫ হাজার টাকা, ১ কেজি ২শ গ্রামের মন ৫০ হাজার টাকা, ১ কেজি সাইজের ইলিশের মন ৪৮ হাজার টাকা এবং এলসি সাইজের ইলিশের মন ৪০ হাজার টাকায় বেচাকেনা হয়েছে। ভরা মৌসুম হলেও মাছের আমদানি খুব খারাপ জানিয়ে শাকিল বলেন, কোন নদীতে মাছ পড়ছে না জেলেদের জালে। কোথায় গেল মাছ সৃস্টিকর্তাই ভাল জানেন। কিছুদিন আগের প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারনে সমুদ্রেও ট্রলার অবস্থান করতে পারেনি। বিপদ সংকেত থাকায় তাদের বোট নিয়ে ফিরে আসতে হয়েছে। এজন্য মোকামে নেই সামুদ্রিক ইলিশও। ভরা মৌসুম হওয়ার পরেও একেবারেই ইলিশ শুন্য অবস্থায় অলস সময় পার করছেন বলেন তিনি। আর মাত্র ৩ দিন পর ২২ দিনের জন্য সকল কর্মচারিরা বেকার হয়ে যাবে নিষেধাজ্ঞার কারনে। এখন আমদানি ভাল থাকলে তাদের জন্য ভাল হতো। এখন নিষেধাজ্ঞার সময়টি অভাব অনটনের মধ্যে কাটাতে হবে শ্রমিকদের। এ বছর এমন হলেও ইলিশ রক্ষার জন্য তারা এ বছরও নিষেধাজ্ঞা পালন করবেন শতভাগ বলেন শাকিল। কারন ইলিশের আমাদানী বাড়াতে হলে নিষেধাজ্ঞা মানার কোন বিকল্প নেই বলে জানান তিনি।

এ বিষয়ে বরিশাল জেলা মৎস্য আড়তদার অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক নীরব হোসেন টুটুল বলেন, মাছের আমদানী খুবই হতাশাজনক। আমদানী তো দুরের কথা স্থানীয় চাহিদা মেটানোর মতো ইলিশ ঘাটে আসছে না। স্বভাবতই ক্রেতারা তাই তাদের মতই হতাশ হচ্ছে। এবার সমুদ্রে বিপদ সংকেতের কারনে মাছ ধরা ট্রলার অবস্থান করতে না পারায় মাছের বেশ ঘাটতি পোহাতে হচ্ছে। এছাড়াও নদীতেও মাছ নেই। তার পরেও আগামী ৪ অক্টোবর থেকে সরকারি নির্দেশনা মোতাবেক ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা পালন করবেন বলে জানান তিনি। একই সাথে শীঘ্রই আবার বরিশালের ইলিশ মোকাম মাছের আমদানিতে সমৃদ্ধ হয়ে উঠবে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

উল্লেখ্য আগামী ৪ অক্টোবর থেকে ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত ২২ দিন সারাদেশে ইলিশ ধরা বন্ধ থাকবে বলে জানিয়েছে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়। ২২ সেপ্টেম্বর মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. ইফতেখার হোসেন স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। প্রতিবছর আশ্বিনের ভরা পূর্ণিমার আগে-পরে মিলিয়ে মোট ১৫ থেকে ১৭ দিন হচ্ছে ইলিশের ডিম ছাড়ার আসল সময়। এসময় সাগর থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ নদীতে ছুটে আসে। এই সময়কে বিবেচনায় নিয়ে প্রতিবছরের ন্যায় এ বছরও মোট ২২ দিন ইলিশ ধরা নিষিদ্ধ করেছে সরকার। এ সময় ইলিশকে স্বাচ্ছন্দ্যে ডিম ছাড়ার সুযোগ দিতেই সরকার দেশের সব নদ-নদীতে ইলিশসহ সব ধরনের মাছ ধরা বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছে।

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin