হত্যা হামলার বাদীকে ঘুষ দিতে হলো ১৫ শতাংশ জমি !

নিজস্ব প্রতিবেদক ॥ বরিশালের সদর উপজেলার রায়পাশা-কড়াপুর ইউনিয়নের ১নং ওয়ার্ডের পরপর পাঁচবারের মেম্বর হাবিবুর রহমান মিন্টুকে জব্দ করতে হত্যা মামলায় জড়ানোর অভিযোগ উঠেছে। এর পিছনে কলকাঠী নাড়ছেন ওই ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান। এর সাথে যুক্ত হয়েছে মামলার বাদী ফারুক মল্লিকের চাচাতো ভাই পুলিশ কনস্টেবল সিদ্দিকুর রহমান মল্লিক।
ইতিমধ্যে মামলা পরিচালনার জন্য বাদীর নিকট থেকে ঘুষ বাবদ নগদ অর্থ নেয়ার পাশাপাশি ১৫ শতাংশ জমিও লিখিয়ে নিয়েছে সিদ্দিক। বাদী কোনভাবে মামলা চালাতে না চাইলেও ওই দুইজন তাকে দিয়ে জোরপূর্বক মামলা চালাচ্ছে। ওই দুইজনের শত্রুতার কারনে দীর্ঘ দেড় বছরের অধিক সময় ধরে মেম্বর মিন্টুসহ ৩ জনকে নানাভাবে হয়রানি হতে হচ্ছে। কোনভাবেই মামলা থেকে পরিত্রাণ মিলছে না।
গত বছরের ১৮ জানুয়ারী নিহত ছালাম মল্লিকের ছেলে ফারুক মল্লিক বাদী হয়ে মেম্বর মিন্টু, কাওছার হাওলাদার, খলিলুর রহমান, রাব্বি হাসান, জলিল হাওলাদার, রহিম হাওলাদারকে আসামী করে মামলা দায়ের করেন।
একাধিক স্থানীয়রা বলেন, মেম্বর মিন্টু এলাকায় জনপ্রিয় হওয়ায় তার শত্রুও বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে সাবেক ওই চেয়ারম্যান ধারণা মিন্টু চেয়ারম্যান নির্বাচনে অংশ নিলে তিনি আর কখনো নির্বাচিত হতে পারবে না। এ কারনে মিন্টুর প্রধান শত্রু হচ্ছে সাবেক চেয়ারম্যান। তার মদদেই এ মামলা দায়ের হয়। যেখানে ঘটনার সাথে জড়িত না হয়েও মিন্টুসহ আরো তিনজনকে এ মামলায় জড়ানো হয়।
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী শহিদুল ইসলাম বলেন, আমি ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখি ছালাম মল্লিক কাওসারের দোকানের সামনে বসে আছে। আমি জানতে চাই ‘চাচা কি হয়েছে। তিনি (ছালাম) জানান ‘বাবা আমারে ওরা মারছে’। কেন মারা হলো জানতে চাইলে দোকানদার কাওসার জানায়, ছালাম এর আগে তার দোকান থেকে বিস্কুট খেয়ে টাকা দেয়নি। আজকে আবার না বলে আমার দোকানের বিস্কুট খাইছে। আমি বাধা দিলে আমাকে মারধর করতে আসে। এনিয়ে বাকবিতন্ডার এক পর্যায়ে আমি ছালামকে দুটি ঘুষি মারছি। পরে বিষয়টি ওখানেই নিষ্পত্তি হয়। এরপর ফরিদ মেম্বার নামে এক ব্যক্তি ছালামকে বাড়ীতে দিয়ে আসে। ৫দিন ছালাম মল্লিককে শের-ই বাংলা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
প্রত্যক্ষদর্শী সিরাজুল ইসলাম বলেন, নিহত ছালাম একজন মানসিক প্রতিবন্ধী। তার হাতে সব সময় লাঠিসোটা থাকতো। এর আগে সে বাজারের স্থানীয় ব্যবসায়ী রহিম এবং তার (ছালাম) আপন ভাইকে কুপিয়ে জখম করে। কাওসারের সাথে ছালামের টুকটাক মারামারি হইছে। কিন্তু মারাতো গেছে ঘটনার ৫/৬ দিন পরে। ঘটনার পরের দিনও মারা যায়নি।
স্থানীয় একাধিক ব্যক্তির সাথে কথা বলে জানা গেছে, বাদী ফারুক মল্লিক একজন দরিদ্র পরিবারের ছেলে। এলাকায় কৃষিকাজ করে কোনমতে জীবিকা নির্বাহ করেন তিনি। মামলা চালাতে গিয়ে পুরোপুরি নিঃস্ব হয়েছেন। এর উপরে হয়েছেন আবার প্রতারণার শিকার। শুরু থেকেই মামলা দায়ের কিংবা মামলা চালানোর কোন ধরণের চিন্তা ছিল না ফারুকের। কিন্তু সাবেক এক চেয়ারম্যান, জাকির চৌধুরী ও তার ভাই রফিক চৌধুরী মিলে মিন্টু মেম্বরের উপর পুরনো প্রতিশোধ নিতে হত্যা মামলাকে পূঁজি হিসেবে ব্যবহার করেন। বাদী মামলা করতে গিয়ে টাকাতো হারিয়েছেনই এর উপরে ১৫ শতাংশ জমিও লিখে দিতে হয়েছে তার আপন চাচাতো ভাই পুলিশ কনস্টেবল সিদ্দিক মল্লিককে।
সিদ্দিক সিআইডির হেডকোয়ার্টারে কর্মরত। মামলার খরচ দেখিয়ে ফারুকের কাছ থেকে ১৫ শতাংশ জমি লিখে নেয় সিদ্দিক। শুধু তাই নয় মামলাটি ঝুলিয়ে রাখার কৌশল হিসেবে তদন্তকারী কর্মকর্তাদেরও নানাভাবে বিভ্রান্ত করছেন তিনি। এই সিদ্দিক এক সময় বেশ কয়েকজন ডিআইজির বাসায় দায়িত্ব পালন করেছেন। সেই ক্ষমতা বলে এবং তাদের নাম ভাঙ্গিয়ে প্রচুর টাকার মালিকও বনে গেছেন। নামে-বেনামে রয়েছে অনেক সম্পদ। কোন মামলায় তার কথামত তদন্ত প্রতিবেদন না দিলে উপর মহল থেকে ফোন করিয়ে নানা ধরণের ভয়ভীতি দেখানো হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
মেম্বর হাবিবুর রহমান মিন্টু বলেন, ‘রায়পাশা-কড়াপুর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ও সদর উপজেলা বিএনপির সহ-সভাপতি নুরুল আমিনের সাথে আমার রাজনৈকিতসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বিরোধ চলছে। এছাড়া স্থানীয় জাকির চৌধুরী ও তার ভাই রফিক চৌধুরীর সাথে আমার অনেক বছর ধরে জমি সংক্রান্ত বিরোধ রয়েছে। মূলত তারা একাট্টা হয়ে বাদীকে দিয়ে জোর করে আমাকে হত্যা মামলার ৬ নম্বর আসামী করেছেন। মিন্টু অভিযোগ করেন, সিআইডিতে চাকরী করে হাকিম মল্লিকের ছেলে সিদ্দিক মল্লিক। এই সিদ্দিক এক সময় প্রেম করে একটি মেয়েকে বিয়ে করেন। তখন সে বরগুনা থাকতো। স্থানীয় থানায় সিদ্দিকের নামে মামলাও হয়। সিদ্দিকের বাবা এত মামলাবাজ ছিল তাকে মানুষ বলতো কেস মল্লিক। এক পর্যায় সিদ্দিক তার স্ত্রীকে ঘরে উঠাতে অস্বীকৃতি জানালে তাকে (সিদ্দিক) একটু গালমন্দও করি। এর জের ধরে সিদ্দিক পেছনে বসে কলকাঠি নাড়ছে সিদ্দিক।
এ ব্যাপারে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘মামলা প্রত্যাহার করতে হলে কোর্ট থেকে করতে হবে। এখানে পুলিশের কোন হস্তক্ষেপ নেই। আর বাদী আপোষ মীমাংসা করেছে কিনা আমি জানিনা। নুরুল আমিন বলেন, হত্যা মামলা সম্পর্কে আমার কিছুই জানা নেই। এমনকি মেম্বর মিন্টুর সাথেও আমার কোন শত্রুতা নেই। তাদের অভিযোগ সঠিক নয় বলে দাবি করেন তিনি।
মামলার বাদী ফারুক মল্লিক বলেন, ‘মিন্টু মেম্বারসহ আরও অনেককে অন্তর্ভূক্ত করে ভুল করেছি। একটি পক্ষ আমাকে দিয়ে জোর করে ওই সব নিরীহ ব্যক্তিদের আসামী করাতে বাধ্য করেন। আমি এখন মামলাটি চালাবো না, আপোষে যাবো। কিন্তু ওই পক্ষ সেই আপোষ মীমাংসার ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি বলেন,‘ গত ৯ সেপ্টেম্বর স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান হাবিবুর রহমান খোকনের উপস্থিতিতে আপোষনামায় আমি স্বাক্ষর করেছি। আপোষনামায় এতে বাদী উল্লেখ করেন ‘একটি কুচক্রি মহল তাকে দিয়ে মামলাটি করিয়েছেন। ঘটনার সাথে মিন্টু জড়িত ছিলেন না’।
এ ব্যাপারে কনস্টেবল সিদ্দিকুর রহমান মল্লিকের সাথে যোগাযোগ করলে তিনি বলেন, নিহত ছালাম মল্লিক আমার চাচা। তার কাছ থেকে যদি আমি জমি নিয়ে থাকি তারতো প্রমান থাকবে। যারা এ ধরণের অভিযোগ করে তারা পারলে প্রমান হাজির করুক।

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin