সিটি নিউজ ডেস্ক >> বরিশালে আলোচিত সাময়িক বরখাস্ত হওয়া বরিশাল বিভাগের সদ্য সাবেক বন কর্মকর্তা (ডিএফও) কবির হোসেন পাটোয়ারী ২ নারীকে আসামী করে বরিশাল মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আমলী আদালতে গত ১৬ সেপ্টেম্বর দন্ডবিধি আইনের ৫০০/৫০১/৫০২ ধারায় একটি মামলা দায়ের করেছেন। মামলা নং-৪৬১।
ঐ দুই নারী হলেন- খুলনা সোনাডাঙ্গা সবুজবাগ এলাকার মোঃ মফজলুর রহমানের কন্যা খাদিজা আক্তার রত্না (৪০) ও বাগেরহাট বুড়িয়া ডাংগা দ্বিগরাজ কলেজ মোড় এলাকার মোঃ মতিয়ার রহমানের কন্যা নাসরিন আক্তার দোলন (৪০)। তারা দুইজনই তার সাবেক স্ত্রী। বহু আগেই তাদের তালাক প্রদান করা হয়েছে বলে মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে গত ১৭ সেপ্টেম্বর রাতে বরিশাল সদর রেঞ্জের ফরেস্টার মোঃ আবু সুফিয়ান সাকিবের নেতৃত্বে সাবেক (ডিএফও) মো. কবির হোসেন পাটওয়ারীকে আটকে মব সৃষ্টি ৭ লাখ টাকা চাঁদাদাবী, নিজের ক্রয়কৃত খাট নিতে বাঁধা এবং অকথ্য ভাষায় গালিগালির অভিযোগে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ও একই মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং প্রধান বন সংরক্ষক বরাবরে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন বরিশাল নগরীর কাশিপুর বাজার এলাকার বাসিন্দা সচেতন নাগরিক মোঃ সোহেল রানা। মন্ত্রণালয়ে দায়েরকৃত লিখিত অভিযোগে সোহেল রানা উল্লেখ করেছেন গত ১৭ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যার পরে তিনি কাশিপুর বন বিভাগের রেস্ট হাউজের নিচে প্রচুর মানুষ লাঠিসোটা নিয়ে হইহুল্লর করতে দেখেন। তিনি সেখানে গিয়ে দেখতে পারেন বরিশাল সামাজিক বন বিভাগের বিদায়ী ডিএফও কবির হোসেন পাটোয়ারীকে বরিশাল সদর রেঞ্জের ফরেস্টার মোঃ আবু সুফিয়ান সাকিবের নেতৃত্বে ঘেরাউ করে মব সৃষ্টিকরে তার নিকট ৭ লাখ টাকা চাঁদা দাবী করেন। এমনকি ডিএফও’র নিজের ক্রয়কৃত একটি খাট নিতে বাঁধা দেন এবং অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেন সাকিব। একই সাথে তার এসিআর-এ ভাল রিপোর্ট দিয়ে যাওয়ার জন্য ডিএফওকে চাপ প্রয়োগ করেন। খবর পেয়ে মব বাহিনীর কাছ থেকে ডিএফওকে উদ্ধার করে এয়ারপোর্ট থানায় নিয়ে যায় পুলিশ। থানায় নেয়ার পর বিমানবন্দর থানার ওসি আল মামুন উল ইসলাম ফরেস্টার সাকিবের কাছে জানতে চান তিনি (ডিএফও)র কাছে কি বাবদ ৭ লাখ টাকা পাবেন। এসময় ফরেস্টার সাকিব ওসির প্রশ্নের কোন সুদউত্তর দিতে না পারায় তার কাছ থেকে লিখিত মুচলেকা রেখে কবির হোসেন পাটোয়ারীকে তার গন্তব্যের উদ্দেশ্যে যাত্রা করতে অনুরোধ করেন।
উল্লেখ থাকে যে, ১৭ সেপ্টেম্বর কবির হোসেন পাটোয়ারী রংপুর রেঞ্জে যাওয়ার উদ্দেশ্যে রওনা হলে দুর্নীতিবাজ সাবেক বিভাগীয় বন কর্মকর্তা ড. এম.এ আউয়াল এর প্রধান সহযোগী আবু সুফিয়ান সাকিব, এম.এম. কর্পোরেশনের সত্বাধিকারী ঠিকাদার মাহফুজুর রহমান মিলন, বরিশাল গণপূর্ত এর ঠিকাদার মোঃ মামুন, কাশিপুর রেস্ট হাউজের ওয়াচার (পাহারাদার) মোঃ রফিক, বরিশাল উপকূলীয় অঞ্চলের বন সংরক্ষকের ড্রাইভার মোঃ আবুল কালাম, বাংলোর চৌকিদার মোঃ আবুল কালাম তালকুদার, বন সংরক্ষকের নাইটগার্ড মোঃ ফরিদ, কাশিপুর নার্সারী কেন্দ্রের মোঃ আলমগীর হোসেন খান, কাশিপুর বন নার্সারী কেন্দ্রের বন প্রহরী মোঃ তাহেরুল ইসলাম, সাবেক আউটসোর্সিং কর্মী মোঃ শফিকুল ইসলাম সুজন সহ তাদের অর্ধশত সাঙ্গপাঙ্গরা একাট্টা হয়ে কাশিপুর বন বিভাগের রেস্ট হাউজের নিচে মব সৃষ্টি করেন। এ সময় খবর পেয়ে কবির হোসেন পাটোয়ারীকে বিমানবন্দর থানা পুলিশ উদ্ধার করে থানায় নিয়ে গেলে কতিপয় মিডিয়ায় ফলাও করে সংবাদ প্রকাশ করা হয় ‘রাতের আঁধারে পালানোর সময় বন কর্মকর্তা আটক’। প্রকৃতপক্ষে তাকে থানায় নেয়ার আধাঘন্টার মধ্যেই কারও কোন আপত্তি না থাকায় কবির হোসেন পাটোয়ারীকে ছেড়ে দেয়া হয়।
ভুক্তভোগী কবির হোসেন পাটোয়ারী জানান, তিনি বরিশাল সামাজিক বন বিভাগে যোগদানের পর থেকে ডিভিশনের স্বচ্ছতা ফিরাইয়া আনার জন্য বিভিন্ন কার্যক্রম গ্রহন করলে ফরেস্টার আবু সুফিয়ান সুবিধা বঞ্চিত হওয়ায় বিভিন্নভাবে তাকে নাজেহাল করার চেষ্টা করতে থাকে। এছাড়া ঠিকাদার মাহফুজুর রহমান মিলন ও কিছু সংখ্যক চাকুরি চলে যাওয়া আউট সোর্সিং কর্মী ফরেস্টার আবু সুফিয়ান এর সাথে যোগ দিয়ে বিভিন্ন ষড়যন্ত্র আটতে থাকেন। তারও ধারাবাহিকতায় বিভিন্ন মিডিয়ায় তার নামে মিথ্যা ১৭ বিয়ের কাল্পনিক কাহিনী সাঁজিয়ে ফলাও করে সংবাদ প্রচার করায়।
সূত্রে জানা গেছে, বরিশাল বিভাগীয় সাবেক বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. কবির হোসেন পাটওয়ারীর বিরুদ্ধে বহুবিবাহ ও প্রতারণার যে অভিযোগ সম্প্রতি কয়েকটি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে, তা সম্পূর্ণমিথ্যা ও কাল্পনিক। প্রতিবেদনগুলোতে ২ নারী ছাড়া অন্য কোন “স্ত্রীদের” নাম, ঠিকানা বা সুনির্দিষ্ট তথ্য প্রমাণ নেই। সাবেক (ডিএফও)ড. মোঃ আব্দুল আউয়ালকে ২০২৪ সালের ১১ মার্চ ওএসডি করার পর তার ঘনিষ্ট সহচর ফরেস্টার আবু সুফিয়ান সাকিব ও ঠিকাদার মাহফুজুর রহমান মিলন কজ্বা করেন বরিশাল বিভাগীয় বন। বছর খানেক পূর্বে কবির হোসেন পাটোয়ারী বরিশালে যোগদান করলে সাকিব-মিলন ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিল করতে না পেরে তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন ষড়যন্ত্র করেন। কবির হোসেন পাটোয়ারী বন বিভাগের বিভিন্ন উন্নয়নকাজে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করায় চক্রটি ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন এবং ‘মিথ্যা প্রোপাগান্ডা’ ছড়ায়। শুধু সংবাদ নয় এই চক্রটি সংশ্লিস্ট মন্ত্রণালয়ে লিখিত অভিযোগ দিয়ে পাটোয়ারীকে হয়রানি করে আসছে।
সবশেষ গত ১১ সেপ্টেম্বর কাশিপুর বন সংরক্ষক কার্যালয়ের মূল ফটকের সম্মুখে ঠিকাদার মিলনের খুঁজে আনা কয়েকজন নারী ও যুবক ‘ভুক্তভোগী পরিবার ও সুশীল সমাজের’ ব্যানারে মানববন্ধন করেন। নির্ভরযোগ্য সূত্র নিশ্চিত করেছে ঠিকাদার মাহফুজুর রহমান মিলন গত বছর আউটসোর্সিং এর মাধ্যমে তার ঘনিষ্ঠ ৬ ব্যাক্তিকে নিয়োগ প্রদান করেন। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আউটসোর্সিং কর্মচারীদের চাকরীর নীতিমালা পরিবর্তনের কারনে আউটসোর্সিং-এ নিয়োগ পাওয়া ঐ ৬ ব্যক্তিদের নিয়োগ বাতিল হয়ে যায়। একই সাথে ঐ শূন্য কোটায় কর্মচারী নিয়োগের জন্য সদ্য সাবেক বন কর্মকর্তা কবির হোসেন পাটওয়ারী টেন্ডার আহবান করেন। কিন্তু ঠিকাদার মিলন টেন্ডারে অংশ না নিয়ে তার পছন্দের ঐ ৬ব্যক্তিকে নিয়োগ দিতে (ডিএফও)কে অব্যাহত চাপ প্রয়োগ করে আসছিলেন।
বিশ্বস্ত সূত্র নিশ্চিত করেছে, সুফল প্রকল্পের আওতায় কাশিপুর বন সংরক্ষক কম্পাউন্ডে সাড়ে ৩ কোটি টাকা ব্যয়ে ভবন নির্মাণ প্রকল্পে অনিয়ম দুর্নীতির প্রতিবাদ করায় ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান কবির হোসেন পাটওয়ারীর উপর বেজায় চটে যায়। এছাড়া কাশিপুর বন সংরক্ষক কার্যালয়ে দিনদুপুরে বন বিভাগের কয়েকজন স্টাফের সহযোগীতায় মাদকের আসর বন্ধ করায় তারাও সংক্ষুব্ধ হয়ে কবিরের বিরুদ্ধে জোটবদ্ধ হয়ে মাঠে নামেন। অপর আরেকটি সূত্র নিশ্চিত করেছে বরিশাল বন বিভাগে (ডিএফও)পদ শূন্য রাখতে পারলে বাধাহীনভাবে কতিপয় ফরেস্টার মিলেমিশে সরকারী বরাদ্দকৃত অর্থ পুরোটাই লুটপাট করতে পারেন। কিন্তু (ডিএফও) থাকলে সরকারী বরাদ্দকৃত অর্থ লুটপাট করতে তাদের সমস্যা হয়। সে কারনেও কবিরের বিরুদ্ধে দুর্নীতিবাজ ফরেস্টার চক্রটি ষড়যন্ত্র করে তাকে বরিশাল থেকে বিতারিত করে স্বার্থক হয়।
এবিষয়ে সাবেক (ডিএফও) মো. কবির হোসেন পাটওয়ারী বলেন, আমি বরিশাল সামাজিক বন বিভাগে যোগদানের পর থেকেই বিভাগের স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেছি। এর ফলে কিছু স্বার্থান্বেষী মহল ক্ষুব্ধ হয়। ফরেস্টার আবু সুফিয়ান সাকিব, ঠিকাদার মাহফুজুর রহমান মিলন, বরিশাল গণপূর্ত এর ঠিকাদার মোঃ মামুন এবং চাকরি হারানো কিছু আউটসোর্সিং কর্মী মিলে আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র শুরু করে। তারা একদিকে আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা বিয়ের গল্প ছড়িয়ে সংবাদ মাধ্যমে প্রচার করেছে, অন্যদিকে মন্ত্রণালয়ে মিথ্যা অভিযোগ দিয়েছে। ১৭ সেপ্টেম্বর আমাকে জোরপূর্বক অবরুদ্ধ করে সাত লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়। পরে পুলিশ আমাকে উদ্ধার করে। বাস্তবে আমি দুর্নীতি দমন ও বন বিভাগের উন্নয়ন প্রকল্পে স্বচ্ছতা আনার জন্য কাজ করেছি। এজন্য চক্রটি আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা প্রোপাগান্ডা ছড়িয়েছে। বন বিভাগের বরাদ্দ লুটপাটের জন্য তারা ডিএফও পদ খালি রাখতে চেয়েছে।
আমি দৃঢ়ভাবে বলছি, আমার বিরুদ্ধে আনা বহুবিবাহ বা প্রতারণার অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা, কাল্পনিক এবং ভিত্তিহীন। বন বিভাগের ভেতরের দুর্নীতিবাজ চক্রের স্বার্থ রক্ষা না করাতেই আমাকে হয়রানি করা হচ্ছে।”
বরিশাল উপকূলীয় অঞ্চলের বন সংরক্ষক মিহির কুমার দো জানান, ১৭ সেপ্টেম্বরের ঘটনা সম্পর্কে মন্ত্রণালয় অবগত আছে। এ অবস্থায় আমি কোন মন্তব্য করতে চাই না। বিষয়টি আমার উপর মহল দেখছে।
বরিশাল সদর রেঞ্জের ফরেস্টার মোঃ আবু সুফিয়ান সাকিব বলেন, তিনি আমার অনেক ক্ষতি করেছেন, আল্লাহ সে জন্য তাকে লাঞ্ছিত করেছে। এর চেয়ে বেশি কিছু বলতে চাই না ভাই।





